গুম অধ্যাদেশ বাতিল ও আইনি সঙ্কট : ৩ বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ

গুম অধ্যাদেশ বাতিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক : ড. শরীফ ভূঁইয়া

বিগত সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি গুমের শিকার হয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। অথচ সেই গুমের বিচার পাওয়ার যে আইনি পথটি তৈরি হয়েছিল, সেটিই আজ বাতিল হয়ে গেল। অধ্যাদেশে যদি কোনো বিতর্কিত বিষয় থাকত, তবে তা সংশোধনী আকারে আনা যেত। কিন্তু সরাসরি বাতিলের ফলে গুম প্রতিরোধে যে স্বাধীনতা ও সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা আর থাকল না।

আলমগীর কবির
Printed Edition
ড. শরীফ ভূঁইয়া
ড. শরীফ ভূঁইয়া

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংগঠিত গুমের ঘটনাবলি তদন্ত ও প্রতিকারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাতিল করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীর মাধ্যমেই গুমের বিচার সম্ভব, তাই পৃথক অধ্যাদেশের প্রয়োজন নেই। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে এবং আইনি মহলে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অধ্যাদেশটি কি সত্যিই অপ্রয়োজনীয় ছিল, নাকি এর বাতিলের ফলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো নতুন কোনো আইনি অনিশ্চয়তায় পড়ল? এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের আইনি বিশ্লেষণ ও ভিন্নধর্মী মতামত তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের দুই বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও শিশির মনির। নিচে তাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারগুলো তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন : মঙ্গলবার গুম অধ্যাদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হলো। আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী?

ড. শরীফ ভূঁইয়া : এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং জাতির জন্য একটি বড় বিচ্যুতি। আমরা জানি, বিগত সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি গুমের শিকার হয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। অথচ সেই গুমের বিচার পাওয়ার যে আইনি পথটি তৈরি হয়েছিল, সেটিই আজ বাতিল হয়ে গেল। অধ্যাদেশে যদি কোনো বিতর্কিত বিষয় থাকত, তবে তা সংশোধনী আকারে আনা যেত। কিন্তু সরাসরি বাতিলের ফলে গুম প্রতিরোধে যে স্বাধীনতা ও সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা আর থাকল না।

প্রশ্ন : এই অধ্যাদেশটি বহাল থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কী ধরনের সুবিধা পেত?

ড. শরীফ ভূঁইয়া : এই অধ্যাদেশটি ছিল ভুক্তভোগীদের আশ্রয়ের জায়গা। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি গুম হলে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মানবাধিকার কমিশনকে, যা বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করত। এ ছাড়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকা পুরনো গুমের মামলাগুলো কিভাবে নিষ্পত্তি হবে, তার একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন ছিল এখানে। এখন এই অধ্যাদেশটি না থাকায় একটি বিশাল আইনি শূন্যতা তৈরি হবে।

প্রশ্ন : গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সুরক্ষা ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে, এই বাতিলের ফলে সেখানে কী প্রভাব পড়বে?

ড. শরীফ ভূঁইয়া : এখানে বড় একটি সঙ্কট তৈরি হবে। অধ্যাদেশটিতে বলা ছিল, যদি ৫ বছরের মধ্যে কোনো গুম হওয়া ব্যক্তি ফিরে না আসেন, তবে তার সম্পত্তি কিভাবে বণ্টন হবে এবং তার উত্তরাধিকারীরা কিভাবে আইনি সুরক্ষা পাবেন। এখন এই বিধানটি বাতিল হওয়ার ফলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো আবারো সেই পুরনো অনিশ্চয়তা এবং আইনি লড়াইয়ের গোলকধাঁধায় পড়ে যাবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ তো আন্তর্জাতিক গুম বিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে। এই অধ্যাদেশ বাতিল কি সেখানে কোনো প্রভাব ফেলবে?

ড. শরীফ ভূঁইয়া : অবশ্যই। আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করার পর দেশে যদি সেই সংক্রান্ত কার্যকর কোনো আইন না থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের দেশের বিচারিক সদিচ্ছা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠবে। এতে বিচার নিয়ে সংশয় আরো বাড়বে।

প্রশ্ন : আপনি এই বাধার পেছনে ‘আমলাতন্ত্রকে’ দায়ী করছেন। বিষয়টি যদি একটু পরিষ্কার করতেন?

ড. শরীফ ভূঁইয়া : দেখুন, এগুলো কোনো নিছক রাজনৈতিক সংস্কার নয়, এগুলো ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা এখন আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে আটকে যাচ্ছে। আমলাতন্ত্রের পর্যালোচনা ও পরামর্শ অনুযায়ীই বর্তমান সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল প্রতিরোধক শক্তি হিসেবে আমলাতন্ত্রই কাজ করছে।

প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত এই বাতিলের ফলে আমরা কি আগের সেই অবস্থানেই ফিরে যাচ্ছি?

ড. শরীফ ভূঁইয়া : ঠিক তাই। সরকার যদি এই আইনকে আরো শক্তিশালী করতে চাইত, তবে নতুন আইনের মাধ্যমে সেটি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু অধ্যাদেশটি সরাসরি বাতিলের মাধ্যমে আমরা সেই আগের অনিরাপদ অবস্থায় ফিরে গেলাম। আগে গুমের বিষয়ে যেরকম আইনি অসহায়ত্ব ছিল, এখন আবার ঠিক সেরকমই হচ্ছে। এতে আলটিমেটলি কোনো লাভ হলো না; বরং অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা থমকে গেল।