ইশতেহার হলো রাজনৈতিক দলের লিখিত পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির বরাত- অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিকসেবা, আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রের জন্য যে লক্ষ্য, নীতি এবং কর্মপরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা। এটি সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাস্তবায়িত হতে পারে এমন প্রতিশ্রুতি থাকে এবং ভোটারদের কাছে কার্যকর নীতির প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, বিএনপির ৫১ পয়েন্টের ইশতেহারে কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ইত্যাদি উল্লেখ করেছে এবং তারা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ ও মানবিক-সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াতও ২৬টি অগ্রাধিকার সংবলিত ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
ইশতেহার যেমন বিমূর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেয়, ভোটাররা তুলনা-ভাবনা করে যে দল কোনটি বাস্তবায়ন সম্ভব এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর তাই ইশতেহার বাস্তব ইস্যুতে ভোটারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
বয়ান বা আখ্যান : বয়ান হলো নেতাদের মুখোমুখি বক্তব্য, জনসভার ভাষণ, গণমাধ্যমে মন্তব্য যা সরাসরি ইমোশন এবং রাজনৈতিক আগ্রহ টেনে নেয়। এতে অভিমান, প্রতিপক্ষ সমালোচনা, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ঐক্য, মূল্যবোধভিত্তিক বার্তা থাকে। বক্তৃতা অনেক সময় সংক্ষিপ্ত, আবেগপ্রবণ এবং দ্রুত ভাইরাল হয়।
উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন মহিলাদের অধিকার ও সম্মানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে এবং কিছু নেতার মহিলাদের প্রতি অপমানজনক মন্তব্যের বিরুদ্ধে ভোটারদের উত্তর দিতে বলেছেন। এর জবাবে জামায়াতের আমির বলেছেন তার আইডি হ্যাক করে মিসাইল ছোড়া হচ্ছে।
বয়ান সাধারণত ভোটারদের আবেগগত অংশগ্রহণ বাড়াতে, দল-প্রতিপক্ষের মধ্যে স্পেসিফিক ইস্যুতে মতভেদ তৈরি করতে এবং নেতার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বেশি প্রাধান্য পেতে পারে।
কোনটি বেশি প্রভাব ফেলে : সাধারণভাবে, ইশতেহার বেশি নীতিগত ও বাস্তব ইস্যুতে ভোটারকে প্রভাবিত করে- যেমন চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ইত্যাদি পরিকল্পনার প্রতি বিশ্বাস। আর বয়ান বেশি আবেগ, নেতৃত্বের চরিত্র, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে।
ভোটাররা সাধারণত ইশতেহারের বাস্তবায়নযোগ্যতা ও বাস্তব ইস্যুগুলো বিচার করে ভোট দেয়, কিন্তু বয়ানভিত্তিক আবেগ ভোট সচেতন করে তুলতে ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ফলে দু’টি ভিন্ন স্তরে ভোটকে প্রভাবিত করে- ইশতেহার বাস্তব কর্মসূচি নিয়ে ভোটারকে যুক্ত করে, বয়ান ভোটারের আবেগ ও মনোভাব তৈরি করে।
বিএনপির ন্যারেটিভ
মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্র
বিএনপি ৫১-পয়েন্ট ইশতেহারে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রতিশ্রুত করেছে।
দেশে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, চাকরি সৃষ্টি, কৃষি ও উদ্যোগে সহায়তা, আইসিটিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
বিএনপি বলছে তারা ‘সবার আগে দেশ’ নীতি অনুসরণ করবে এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা শক্তিশালী করবে। তাদের ন্যারেটিভে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাতন্ত্র্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
জামায়াতের ন্যারেটিভ
মুক্ত, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামী ৪১-দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে যাতে মানবিক ও নিরাপদ একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার কথা উল্লেখ আছে।
এতে ন্যায়, ইনসাফ, বৈষম্যহীন সমাজ, দখলবাজি-চাঁদাবাজি রোধ, ভুল বিভাজন দূর করে সামাজিক ঐক্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি আছে।
ইশতেহারে নারীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ, যুবকদের কর্মসংস্থান ও মতায়ন, প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
তারা সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, নির্বাচনী পরিবেশ শুদ্ধ করা, বিচার ও মানবাধিকার বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেছে।
সাম্প্রতিক বয়ান আলোচনা
দলের আমির বলেছেন তারা ব্যক্তিগত বা শুধু দলের জয়ের জন্য নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য জয় চায়।
সাম্প্রতিক সময়ে দলের এক নেতা সামাজিক মাধ্যমে নারী-সম্পর্কিত বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্ত নেতা তথ্য প্রমাণ সাথে নিয়ে দেখান তার এক্স প্রেফাইল হ্যাক হয়েছে। এ নিয়ে পরে বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা গ্রেফতারও হন। বিষয়টি নেতাদের বয়ানের প্রভাব ও জনগণের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সারসংক্ষেপ করলে, ইশতেহার ভোটারকে বাস্তব নীতি ও প্রোগ্রামে যুক্ত করে, আর বয়ান ভোটারকে আবেগ ও নেতৃত্বভিত্তিক বিশ্বাসে যুক্ত করে। কোনটা বেশি প্রভাব ফেলে সেটা ভোটারের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, পরিস্থিতি ও ইতিবাচক প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে।



