নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি

রমজানের আগে অস্থির ফলের বাজার

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ফলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, আনার প্রায় সব ধরনের আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশী ফলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীরা চাহিদা বাড়ার কথা বললেও ভোক্তারা বলছেন, রমজানকে সামনে রেখে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজার তদারকির ঘাটতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটকে ঘিরে অনিশ্চয়তাও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

পবিত্র রমজান শুরু হতে আর একদিন বাকি। এরই মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ফলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, আনার প্রায় সব ধরনের আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশী ফলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীরা চাহিদা বাড়ার কথা বললেও ভোক্তারা বলছেন, রমজানকে সামনে রেখে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজার তদারকির ঘাটতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটকে ঘিরে অনিশ্চয়তাও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর নিউমার্কেট, লালবাগ, আজিমপুর, মিরপুর, পল্লবী ও রূপনগর এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা। ফুজি আপেল ৩০০-৩৫০ টাকা এবং সবুজ আপেল ৪০০-৪৫০ টাকা। কমলার দাম ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, নাশপাতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সাদা আঙুর ৫২০-৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০-৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। পার্সিমন ফলের দাম প্রতি কেজি এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

এ দিকে ড্রাগন ফল ২০০-২৫০ টাকা, সফেদা ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শীতের মৌসুমে বরই ও কুল বাজারে এলেও দাম কমেনি। মাঝারি আকারের বরই ১৫০-২০০ টাকা, কুল ২৫০-৩০০ টাকা এবং ছোট বরই ১০০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

রমজানের সবচেয়ে চাহিদা পণ্য খেজুরের বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। জাহিদি খেজুর ২৮০ টাকা, দাবাস ৪৫০-৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০-১,২০০ টাকা, মরিয়ম ১,১০০-১,৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১,২০০-১,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে খেজুর আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হলেও তার সুফল বাজারে প্রতিফলিত হয়নি।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে ফলের ঘাটতি নেই; তবু রমজান মাস এলেই দাম বাড়ে। মিরপুরের ক্রেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগেও মাল্টা-কমলা ২০০-২৫০ টাকায় কিনেছি। এখন একই ফল ৩০০ টাকার ওপরে। আমদানি বন্ধ হয়নি, বাজারেও ফলের অভাব নেই। তাহলে দাম বাড়ছে কেন? গৃহিণী সাবিহা মাহমুদ বলেন, রমজান আসতে এখন দুই দিন আছে। তার আগেই যদি এমন দাম হয়, রমজানে কী হবে। সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

ফল ব্যবসায়ীরা অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। পল্লবীর বিক্রেতা রায়হান মাহমুদ বলেন, পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে। আমদানি ব্যয়, ডলার সঙ্কট ও পরিবহন খরচ বাড়ায় খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ছে। রমজানকে কেন্দ্র করে আড়তে আগাম চাহিদা তৈরি হওয়ায় দাম কিছুটা বাড়তি। অন্য দিকে রূপনগরের বিক্রেতা শামসুদ্দোহা বলেন, বিক্রি আগের তুলনায় কমে গেছে। এখন মূলত অসুস্থ ব্যক্তি বা বিশেষ প্রয়োজনে মানুষ ফল কিনছেন। অনেকেই আধা কেজি বা এক-দু’টি করে কিনে নিচ্ছেন।

ফলের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। ইফতারের অন্যতম উপকরণ লেবুর দাম হালিপ্রতি ৩০-৪০ টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন লেবুর ভরা মৌসুম নয়; সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পরিবহন চলাচল সীমিত থাকায় দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারেনি।

সবজির বাজারেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। করলা ১৬০ টাকা, ঢেঁড়স ১২০ টাকা, কাঁচামরিচ ১২০ টাকা, গোল বেগুন ৮০ টাকা এবং শসা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানে জনপ্রিয় ‘বেগুনি’ তৈরির লম্বা বেগুন ৬০ টাকা কেজি। তবে কিছু পণ্যে সামান্য স্বস্তি আছে। লাউ ৫০ টাকা, টমেটো ৫০ টাকা, আলু ২০ টাকা, ফুলকপি ৩০ টাকা এবং শিম ৪০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাংস ও মাছের বাজারেও বেড়েছে দাম। সোনালি মুরগি ৩৫০ টাকা, ব্রয়লার ১৯০ টাকা এবং গরুর মাংস ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রুই, শিং, কই ও পাবদা মাছের দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। পেঁয়াজ ৬০ টাকা, দেশী রসুন ১২০ টাকা, চায়না রসুন ১৬০ টাকা এবং আদা ১৩০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেসারির ডাল ১০০ টাকা, মুগ ডাল ১৫৫ টাকা, দেশী মসুর ১৬০ টাকা এবং ছোলা ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিনি ১০০ টাকা, বেসন ৮০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পোলাওয়ের চাল ১৪০ টাকা, মিনিকেট ৮০ টাকা এবং আটাশ চাল ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোক্তাদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় রমজান শুরু হওয়ায় বাজারে তদারকি দুর্বল হতে পারে। এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম আরো বাড়াতে পারেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে; ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা বলে আগাম মূল্য সমন্বয় করেন। তবে এ ধরনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি জরুরি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এএইচএম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই ফল ও নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার মনিটরিং যথাযথ না হলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। আমদানি সহজীকরণ, পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা এবং পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত নজরদারি জোরদার না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান শুরুর আগেই ফল ও নিত্যপণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বগতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি ব্যয় সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কৃত্রিম সঙ্কট প্রতিরোধ এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রমজানে এ চাপ আরো বাড়তে পারে এমন আশঙ্কাই এখন ক্রেতা সমাজের প্রধান আলোচ্য বিষয়।