চাপে সরকার, বাড়ছে সমালোচনাও

সংসদের বিরোধী দলও রাজপথে সোচ্চার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর টালমাটাল পরিস্থিতি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের যে আকাক্সক্ষা ছিল, সেটি পূরণ করতে পারছে না। তারা বলছেন, অনেক ইস্যুতে সরকার রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টির কারণে গণতন্ত্রের উত্তরণ সত্ত্বেও দেশে কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা ফিরছে না। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতি ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বয়স দেড় মাস পার হচ্ছে। এ সময়টা সরকার ও বিরোধী দলের জন্য হানিমুন পিরিয়ড হওয়ার কথা। জনগণেরও দু’পক্ষকে কম চাপে রাখার কথা। কিন্তু এই দেড় মাস সময়ে বেশ চাপের মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। একই সাথে নানা কারণে সরকারের সমালোচনাও বাড়ছে। এ ছাড়া সংসদের বিরোধী দলও রাজপথে সোচ্চার অবস্থানে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নজিরবিহীন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর টালমাটাল পরিস্থিতি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের যে আকাক্সক্ষা ছিল, সেটি পূরণ করতে পারছে না। তারা বলছেন, অনেক ইস্যুতে সরকার রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টির কারণে গণতন্ত্রের উত্তরণ সত্ত্বেও দেশে কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা ফিরছে না। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতি ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে।

সূত্র মতে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার শপথের পর থেকে বর্তমান বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দেড় মাসের বেশি সময় পার করেছে। এই অল্প সময়েই অর্থনৈতিক চাপ, ডলার ও আমদানি সঙ্কট, পণ্যের চড়া দাম, জ্বালানি সঙ্কট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক চাপ (হামের প্রাদুর্ভাব), বিরোধী দলের আন্দোলন এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা নতুন সরকারকে ব্যাপক চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে আমেরিকার-ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে যুদ্ধ শুরুর কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশে হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুর অকাল মৃত্যুতে অনেকটা দিশেহারা সরকার। এর সাথে যোগ হয়েছে রাজপথে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচির উপস্থিতি।

জানা গেছে, সরকার গঠনের পরই বিএনপি সরকার বেশ কয়েকটি ইস্যুতে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ (জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি), ডলার ও আমদানি সঙ্কট ছিল উল্লেখযোগ্য। এমন পরিস্থিতিতে যাতায়াত ভাড়াসহ নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে জনমনে ক্ষোভের তীব্রতা আরো বাড়বে। এ ছাড়া শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কলকারখানা বন্ধ হলে রফতানি আয় কমে যাবে এবং বেকারত্ব বাড়বে, যা সরকারকে আরো কঠিন চাপে ফেলে দেবে।

এ দিকে নতুন করে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক চাপ (হামের প্রাদুর্ভাব) সরকারকে ভাবাচ্ছে। চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় হাসপাতালে শয্যা ও আইসিইউ সঙ্কট মোকাবেলা করা এবং দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের মৃত্যু বাড়তে থাকায় সরকারের ওপর সমালোচনার ঝড় ক্রমেই বাড়ছে। টিকাদান কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অপপ্রচার বন্ধ করা সরকারের সামনে একটি কঠিন কাজ। এ ছাড়া তেল নিয়ে বিশৃঙ্খলা, পাচার রোধ ও কালোবাজারি রুখতে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বক্ষণিক সক্রিয় রাখা সরকারের জন্য বড় এক পরীক্ষা। দেশব্যাপী পেট্রলপাম্পগুলোর সামনে এখন গাড়ির দীর্ঘ সারি মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার জ্বালানির রেশনিং শুরু করলেও এর প্রভাব কোথাও পড়ছে না। ফলে সঙ্কট প্রকট হওয়ায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ইতোমধ্যে সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ এবং সপ্তাহে এক দিন এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি স্কুল-কলেজের সময়সূচি পরিবর্তন এবং অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাসে ফেরার চিন্তাও চলছে। ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বোরো চাষিরা দিশেহারা, যার প্রভাব সরাসরি চালের বাজারে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, জ্বালানি সঙ্কট কেবল গাড়ির চাকা নয়, দেশের অর্থনীতির চাকাও শ্লথ করে দিয়েছে।

যদিও গত ২ এপ্রিল সংসদ অধিবেশনে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেছেন, দেশে জ্বালানির কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই বরং ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কেনার প্রবণতাই দীর্ঘ সারির মূল কারণ। মন্ত্রী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সঙ্কট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু আমেরিকা-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের কারণে জনগণের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আগে যে পাম্পের মজুদ তেল বিক্রি হতে দেড় দিন লাগত, এখন সেটি দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি মোটরসাইকেল যেখানে সাধারণত ৫ লিটার তেল নেয়, সেখানে অনেকে দিনে কয়েকবার এসে ১৫ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত সংগ্রহ করছেন। এই অতিরিক্ত মজুদ প্রবণতাই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

হামের প্রাদুর্ভাব বিষয়ে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা: রফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার হামের প্রাদুর্ভাব নির্মূলে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকার চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শ করছে, কিভাবে এই দুর্যোগ থেকে আমরা রেহাই পেতে পারি। তিনি বলেন, হ্যাঁ, এটি ঠিক যে, হামের কারণে অসংখ্য শিশুর মৃত্যুতে অভিভাবকদের মধ্যে একটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কিত হওয়া সমস্যার সমাধান না। কিভাবে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব থেকে রেহাই পেতে পারি, আমাদের প্রচেষ্টা সেই সমাধানের দিকে থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল। অনেকেই সার্বিক সক্ষমতা বিচার না করেই সেটি করেছেন। অর্থসঙ্কটে টিকা সংগ্রহে ব্যাঘাত ঘটে থাকলে সেটি দেখা দরকার। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের মতো নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন। জোর দেয়া হয় খাল খননে। এতে সামাজিক ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানে অগ্রগতি হবে বলেই মনে করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে শুরু হওয়া নানা ইস্যু সরকারের সামনে হাজির হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে। অর্থনীতিবিদরা বলছিলেন, নতুন সরকার এলে বিনিয়োগে গতি আসবে এবং বাড়বে প্রবৃদ্ধি। কর্মসংস্থানে সঙ্কট কাটতে শুরু করবে। বিএনপিও নির্বাচনী ইশতেহারে কাজের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিল। এর বদলে এখন অর্থনীতি নতুন করে সঙ্কটে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে।

এ দিকে অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলার পাশাপাশি বিএনপি সরকারকে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কটও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ ইস্যুতে রাজপথে বিরোধী জোট। গতকাল রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় জোট। এতে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ থেকে নেতারা বলেছেন, জুলাইবিপ্লবের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এই বাংলাদেশে মুনাফেকির রাজনীতি এ দেশের মানুষ আর সহ্য করবে না। নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি জনসম্মুখে এক কথা বললেও নেপথ্যে ভিন্ন আচরণ করছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যদি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেন এবং গণরায়কে হাইকোর্ট দেখান, তবে এ দেশের মানুষ রাজপথে আপনাদের মোকাবেলা করবে। ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকা যাবে না।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, নির্বাচনে বিএনপি গণভোটের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রচার চালিয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সে কারণে গণভোটের রায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ বিএনপির জন্য গৌরবজনক হবে। গণভোটের অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি থাকলেও প্রায় ৭১ শতাংশ ভোটার গণভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন। এ অবস্থায় গণভোটের রায়কে নাকচ করা বিবেচনাসম্মত হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান মামুন বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মতো ইস্যু বুদ্ধিমত্তা ও সদিচ্ছা দিয়ে সামলাতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হতে দেয়া যাবে না। নিকটেই আরেকটি ঈদ রয়েছে। গেল ঈদে যে মাত্রায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে না পারলে সরকার ভবিষ্যতে আরো তীব্রভাবে সমালোচিত হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা আশা করেছিলাম সরকার ও বিরোধী দল চলমান সমস্যাগুলো পরস্পরের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একজন অন্যজনের প্রতি আস্থা রেখে সমস্যাগুলো সমাধান করবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সব কিছু করবে এবং ঐক্যই হবে যেকোনো সমস্যা সমাধানের পথ। কিন্তু এটি থেকে বিচ্যুত হলে সঙ্কট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ফলে একজন নাগরিক হিসেবে অনৈক্য বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কোনোভাবেই আমাদের প্রত্যাশা নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে নামলে তা সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। এ মুহূর্তে রাজনৈতিক সঙ্কট, জ্বালানিসহ ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অন্যান্য সঙ্কট মোকাবেলাকেই সরকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তারা বলছেন, এখন দেশে নির্বাচিত সরকার, সংসদ ও বিরোধী দল আছে। তাদের আচার-আচরণ বা রাজনৈতিক ভূমিকায় সব সময় মনে রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই দেশে আর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না হয়। যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে হবে ঐক্য ও আলোচনার মাধ্যমে। এটি থেকে বিচ্যুত হলে সঙ্কট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।