২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভূকম্পনের নাম। টানা দেড় দশকের বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কাঠামো, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক-সব কিছুর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ রাস্তায় বিস্ফোরিত হয়। অবশেষে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মাত্র তিন দিন পর, ৮ আগস্ট, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। আন্দোলনের ৩৬ দিনে ৮০০-এর বেশি প্রাণহানি ও ১৪ হাজারেরও বেশি আহতের রক্তাক্ত মূল্য এই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু এই অভ্যুত্থান কেবল সরকার পতনের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের সামাজিক ম্যান্ডেট- ‘নতুন বাংলাদেশ’-শীর্ষক গতকাল প্রেস উইং প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি।
এই প্রতিবেদনে আমরা সেই রূপান্তরের প্রথম বছরের হিসাব কষে দেখতে চাই- অভ্যুত্থান থেকে প্রশাসনিক, আইনগত, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যাত্রাপথে বাংলাদেশ কতদূর এগোল।
অভ্যুত্থান: ক্ষোভ থেকে রাষ্ট্রচিন্তার পরিবর্তন
গণ-অভ্যুত্থান ছিল বহুমাত্রিক। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, প্রবাসী পরিবারের সদস্য, নারী, পেশাজীবী সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এটিকে দলীয় রাজনীতির বাইরে নিয়ে যায়। দাবি ছিল সরল: স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, মানবিক রাষ্ট্র।
দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল-
* প্রশাসনে দলীয়করণ
* নিয়োগে স্বজনপ্রীতি
* বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব
* নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ক্ষমতা
* ভূমি ও আর্থিক খাতে দুর্নীতি
অন্তর্বর্তী সরকার এই অভিযোগগুলোকে ‘সিস্টেমিক’ সমস্যা হিসেবে ধরে নিয়ে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। সরকারের ভাষায়, এটি একটি ‘চলমান নথি’ শেষ নয়, বরং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
প্রশাসনে ডিজিটাল নজরদারি : ফলাফলভিত্তিক শাসন
প্রশাসনিক সংস্কারের কেন্দ্রে রয়েছে গভর্নেন্স পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম (জিপিএমএস)। এটি এক ধরনের আইসিটি-নির্ভর কর্মসম্পাদন ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের লক্ষ্য, সময়সীমা ও ফলাফল মাপা হয়।
নতুন ব্যবস্থায়
* তিন বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক
* বার্ষিক লক্ষ্য ও সূচক নির্ধারণ
* ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন
* প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ
ফাইলনির্ভর ধীর প্রশাসন থেকে ফলাফলনির্ভর প্রশাসনের দিকে এই পরিবর্তনকে অনেকেই ‘নীরব বিপ্লব’ বলছেন।
জনপ্রশাসনে নিয়োগেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বিসিএস আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় নামানো, মৌখিক পরীার নম্বর কমানো, বয়সসীমা ৩২ করা এবং অপেক্ষমাণ তালিকা বাধ্যতামূলক করা- এসব সিদ্ধান্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত তরুণদের সুযোগ বাড়িয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার এই উদ্যোগকে ‘অ্যাক্সেস ডেমোক্র্যাটাইজেশন’ হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকেরা।
স্বরাষ্ট্র ও বিচার খাত : আইনের শাসনের প্রত্যাবর্তন?
নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা ছিল জনঅসন্তোষের বড় উৎস। তাই এখানে দ্রুত আইনি আধুনিকায়ন শুরু হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন-
* তদন্তাধীন মামলায় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক
* প্রমাণ না পেলে দ্রুত অব্যাহতি
* রিমান্ড ও গ্রেফতারে প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা
* পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট
* স্বাধীন পুলিশ কমিশন
* কারা সংস্কার আইন-শাস্তি নয়, পুনর্বাসন
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো বিচারব্যবস্থায় গতি ও মানবাধিকার, দুটোকেই জোরদার করবে। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
আইন ও সংসদ বিভাগ : নাগরিকের নাগালে আইন
আইনপ্রণয়নকে পেশাদার ও গবেষণাভিত্তিক করতে বিশেষায়িত উইং গঠন, পুরনো সব বিধি-প্রবিধান সঙ্কলন এবং ‘বাংলাদেশের আইন’ ডিজিটাল ভাণ্ডার হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৭৯৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব আইন এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া গেলে বিচারপ্রার্থীর সময় ও ব্যয় কমবে।
নির্বাচন ও গণমাধ্যম নীতিমালাও নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ভূমিকা স্পষ্ট থাকে।
ভূমি সংস্কার : বিরোধ থেকে ডিজিটাল নিশ্চয়তা
বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত মামলাই সর্বাধিক। তাই ভূমি প্রশাসনে ডিজিটাল রূপান্তর বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উদ্যোগগুলো-
* ৬১ জেলায় ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র
* ডিজিটাল রেকর্ড ও মানচিত্র
* দ্রুত নামজারি
* ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ বিধিমালা
* বালু-মাটি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ
* কৃষিজমি সংরক্ষণ নীতি
‘একটি প্লট-একটি ডিজিটাল রেকর্ড’ বাস্তবায়ন হলে দখল ও জালিয়াতি কমবে, এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
অর্থ ও আর্থিক খাত : শৃঙ্খলা ও অন্তর্ভুক্তি
রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের ছোঁয়া। সরকারি হিসাব নিরীক্ষা আধুনিক করতে পাবলিক অ্যাকাউন্টস অডিট অর্ডিন্যান্স জারি, ডিজিটাল অডিট চালু এবং পারফরম্যান্স অডিট জোরদার করা হয়েছে।
রাজস্ব খাতে নীতি ও প্রশাসন আলাদা করে কর আদায়ে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর ফলে আমদানি-রফতানির লাইসেন্স ও সনদ এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে, সময় ও দুর্নীতি দুটোই কমছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, নতুন বোর্ড, মূলধন বৃদ্ধি, এসব সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনার প্রয়াস। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতাও জোরদার করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা বাজেটে ১.২৬ লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ, জাতীয় বাজেটের ১৬ শতাংশের বেশি, দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় বার্তা।
প্রবাস, শ্রম ও সামাজিক নীতি
প্রবাসীদের জন্য ই-পাসপোর্ট, ডিজিটাল সেবা ও সম্ভাব্য পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা প্রবাসী ভোটাধিকার নিশ্চিতের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মানবপাচার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার হয়েছে।
শ্রম খাতে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন সহজীকরণ, শ্রম আদালত সম্প্রসারণ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ফলে শিল্পে স্থিতিশীলতা আসতে পারে- বিশেষত তৈরী পোশাক খাতে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতার দিকেও নজর দিয়েছে সরকার, ঈদ ও দুর্গাপূজায় বাড়তি ছুটি পারিবারিক সময় ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা বহন করছে।
প্রতীকের রাজনীতি বনাম প্রাতিষ্ঠানিকতা
৮০০-র বেশি স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কেউ বলছেন এটি প্রয়োজনীয় ‘ডি-পার্সোনালাইজেশন’, কেউ বলছেন প্রতীকী রাজনীতি। তবে বার্তাটি স্পষ্ট, রাষ্ট্র ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের।
অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ
এক বছরে অর্জন অস্বীকার করার উপায় নেই।
স্বচ্ছতা, ডিজিটালাইজেশন, নিয়োগে সুযোগ বিস্তার, আইনগত আধুনিকায়ন, মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তবু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
* মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতা
* আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ
* রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব
* অর্থনৈতিক চাপ
* দ্রুত সংস্কার বনাম স্থায়িত্বের দ্বন্দ্ব
ইতিহাস বলে, বিপ্লবের পরের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করা। নীতিমালা লেখা সহজ; আচরণ বদলানো কঠিন।
উপসংহার : স্বপ্ন না বাস্তব?
৫ আগস্ট ছিল বিস্ফোরণ, ৮ আগস্ট ছিল পুনর্গঠনের সূচনা। এই এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত দিকনির্দেশনা দিয়েছে, রাষ্ট্র কেমন হতে পারে।
‘নতুন বাংলাদেশ’ এখনো নির্মাণাধীন। সাফল্য নির্ভর করবে তিন বিষয়ের ওপর, জবাবদিহি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিকের সক্রিয় নজরদারি।
ভূকম্পন ইতোমধ্যেই ঘটেছে। এখন প্রশ্ন, এই কম্পন কি ধ্বংসস্তূপে শেষ হবে, নাকি নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উঠবে একটি আরো ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ?



