আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বগুইরা নদীর অস্তিত্ব এখন কেবলই কাগজ-কলমে। এক সময়ের প্রমত্তা এ নদীটি এখন দখলদারদের কবলে পড়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের মৌন সম্মতি আর ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সরকারি লিজের দোহাই দিয়ে নদীতে স্থায়ী স্থাপনা ও ফিশারি গড়ে তোলা হচ্ছে। শুধু নদীই নয়, পর্যটন সড়কের ঢাল ও সরকারি জমিও এখন প্রভাবশালীদের দখলে।
নিকলীর সোয়াইজনী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে রোদা ও ছেত্রা-হিলোচিয়া হয়ে ঘোড়াউত্রা নদীতে মিশেছে বগুইরা নদী। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী এক সময় ছিল অত্র অঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যের প্রাণ। বড় বড় মালবাহী নৌকা আর ফসলের ট্রলার চলত এ পথে। অথচ বর্তমানে নদীর বুকে দেখা যায় পাকা দালান আর ব্যক্তিগত মাছের খামার। সরেজমিন দেখা যায়, নদী অস্তিত্ব হারালেও এর ওপর নির্মিত কোটি টাকা ব্যয়ের পাঁচটি সেতু এখন কেবলই স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় কৃষক সুলমান ও খাইরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, নদী খননের নামে কেবল লুটপাট হয়েছে। আমরা বাধা দিলেও প্রশাসন কর্ণপাত করেনি। এখন ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্গন্ধে টেকা দায়। বয়োবৃদ্ধ আম্বিয়া খাতুন বলেন, পূর্বপুরুষের কাছে হাজার বছরের এ নদীর গল্প শুনেছি, এখন চোখের সামনে সেটি মরে যেতে দেখছি।
নদী দখলের পাশাপাশি নিকলী পর্যটন সড়কের কারপাশা ইউনিয়নের মজলিশপুর এলাকায় ব্লক সরিয়ে স্থায়ী ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে এক প্রবাসীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের সাথে ‘বিশেষ সখ্য’ থাকার সুযোগে এ নির্মাণকাজ চলছে। এমনকি উপজেলা সদরের গার্লস স্কুল মোড়ে, যেখান থেকে এক বছর আগে অর্ধশতাধিক দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেখানে আবারো রাতের আঁধারে টিনের ঘর তোলা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী শফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সৌন্দর্য রক্ষার দোহাই দিয়ে আমাদের দোকান ভাঙা হলো, এখন কার স্বার্থে আবার সেখানে নতুন ঘর উঠছে?
নদী ও সরকারি জমি দখলের বিষয়ে প্রশাসনের একাধিক স্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সদুত্তর মেলেনি। ৩১ মার্চ বিকেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্ত ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তিকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। এমনকি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার সাথেও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম বলেন, ভূমি সেক্টরসহ নিকলীর বিভিন্ন দফতরে অনিয়ম চরমে পৌঁছেছে। আমরা দ্রুত এসব দখলদারিত্ব বন্ধের দাবি জানাই। পরিবেশবাদীদের শঙ্কা, দ্রুত এ দখল উচ্ছেদ করা না হলে বগুইরা নদী চিরতরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যে ও কৃষি অর্থনীতিতে।



