বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে সতর্ক আশাবাদ

রেমিট্যান্সে শক্তি, আমদানি ব্যয়ে চাপ : ইরান যুদ্ধে পাল্টাতে পারে চিত্র

বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে এবং সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য উদ্বৃত্তে ফিরেছে। তবে একই সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সেবা খাতে বড় ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে এবং সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য উদ্বৃত্তে ফিরেছে। তবে একই সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সেবা খাতে বড় ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮১ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি প্রায় এক বিলিয়ন ডলার কমেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স প্রবাহের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

তবে সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত এখনো কয়েকটি মৌলিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আর ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে অনেক কিছু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। এই যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ না হলে বৈদেশিক খাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

বাণিজ্য ঘাটতি : স্থায়ী চাপের উৎস : বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনো বাণিজ্য ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১১.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই ঘাটতির মূল কারণ আমদানি ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী- এই সময়ে রফতানি আয় হয়েছে প্রায় ২৬.১ বিলিয়ন ডলার। অন্য দিকে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯.৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানি ব্যয় রফতানির তুলনায় প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বেশি।

রফতানি খাতের ক্ষেত্রে খুব বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। বরং আগের বছরের তুলনায় রফতানি সামান্য কমেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প এখনো মোট রফতানির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২৩.৩ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানি কাঠামো এখনো অত্যন্ত সীমিত। তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রফতানি প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

অন্য দিকে আমদানি বাড়ার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ- শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি; জ্বালানি ও জ্বালানি তেলের আমদানি; ভোগ্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি। এসব কারণে আমদানি ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।

সেবা খাতে বাড়ছে ঘাটতি : বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো সেবা খাত। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সেবা খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার।

এই সময়ে- সেবা খাতে আয় (ক্রেডিট) হয়েছে প্রায় ৪.০৩ বিলিয়ন ডলার; বিপরীতে ব্যয় (ডেবিট) হয়েছে প্রায় ৭.৪৮ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয়ের বড় অংশ আসে- আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়; বিদেশী পরামর্শক সেবা; প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সেবা; বিদেশে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সেবা খাতে ঘাটতি কমাতে হলে দেশে উচ্চমূল্যের সেবা খাত- বিশেষ করে আইটি, ডিজিটাল সেবা এবং ব্যবসায়িক সেবা- এর বিকাশ করা জরুরি।

প্রাইমারি ইনকাম : ঋণ ও বিনিয়োগ আয়ের বহির্প্রবাহ : প্রাইমারি ইনকাম খাতেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এই খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলার। এখানে প্রধান কারণ দু’টি- বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মুনাফা প্রত্যাবাসন ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ।

বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ ধীরে ধীরে বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই সময়ে সরকারি সুদ পরিশোধ হয়েছে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়তে পারে, কারণ বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হচ্ছে।

রেমিট্যান্স : বৈদেশিক খাতের প্রধান শক্তি

বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতকে সবচেয়ে বড় স্বস্তি দিচ্ছে প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯.৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১.৮ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করছেন অর্থনীতিবিদরা যার মধ্যে রয়েছে- ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রণোদনা; হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা; মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বড় ধরনের স্থিতিশীলতা এনেছে।

ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট : বিদেশী বিনিয়োগে সীমিত প্রবৃদ্ধি

চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত হয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে- নিট বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে প্রায় ৮৬৭ মিলিয়ন ডলার; পোর্টফোলিও বিনিয়োগে হয়েছে প্রায় ১২২ মিলিয়ন ডলার নিট বহির্প্রবাহ। অন্য দিকে অন্যান্য বিনিয়োগ খাতে নিট প্রবাহ এসেছে প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ এখনো খুব কম। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা; নীতিগত অনিশ্চয়তা; অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট।

বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ ও পরিশোধ

মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি (এমএলটি) ঋণ প্রবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী- নতুন ঋণ প্রবাহ এসেছে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার; বিপরীতে ঋণ পরিশোধ হয়েছে প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলার।

এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি ঋণেও নিট বহির্প্রবাহ রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরো সতর্ক নীতি প্রয়োজন হতে পারে।

সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে ছিল প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি।

অর্থাৎ বৈদেশিক খাতের সামগ্রিক অবস্থান আগের বছরের তুলনায় উন্নত হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

সামগ্রিক উদ্বৃত্তের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী- গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ প্রায় ২৮.৬৮ বিলিয়ন ডলার।

এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায়- ৪.৯ মাসের পণ্য ও সেবা আমদানি অথবা ৫.৫ মাসের পণ্য আমদানি পরিশোধ করা সম্ভব।

এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক হলেও কয়েক বছর আগের তুলনায় এখনো কম।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত এখন একটি ‘মিশ্র সঙ্কেতের পর্যায়ে’ রয়েছে। কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে- রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি; চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে আসা ও সামগ্রিক বৈদেশিক ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত।

তবে একই সাথে কয়েকটি ঝুঁকিও রয়েছে- আমদানি ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি; সেবা খাতে বড় ঘাটতি; বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং রফতানি কাঠামোর সীমিত বৈচিত্র্য।

দীর্ঘমেয়াদি করণীয়

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি আইটি, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতে রফতানি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে দক্ষ জনশক্তি রফতানি বাড়ানো এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা দরকার। চতুর্থত, সেবা খাতে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে বিদেশী সেবার ওপর নির্ভরতা কমে।

সতর্ক আশাবাদের সময়

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বর্তমানে এক ধরনের সতর্ক আশাবাদের পর্যায়ে রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বস্তি দিলেও বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণের চাপ দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে এখনই রফতানি কাঠামো পুনর্গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক খাতের সংস্কার জরুরি।