পিছিয়েছে আসন সমঝোতার ঘোষণা

ভাঙা-গড়ার খেলা ১১ দলে

শেষ পর্যন্ত দলগুলো পৃথকভাবে এক বক্স নীতিতে অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আলোচনার বাইরেও ভিন্ন খবর ও গুঞ্জন রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনসহ দু-একটি দল এ আসন সমঝোতা থেকে বের হয়ে যেতে পারে। তারা পৃথক ইসলামী জোট গঠনেরও চেষ্টায় আছে।

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

গতকাল দিনভর নাটকীয় সময় পার করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিকেল সাড়ে ৪টায় আসন সমঝোতার ঘোষণা দিতে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেও শেষ পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। জানা যায়, চাহিদা অনুযায়ী আসন সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থেকে পিছিয়ে আসে এ জোট। তবে গতকাল দিনভর দফায় দফায় বৈঠক করেছে দলগুলো। দলীয় ফোরাম এবং এক দলের সাথে আরেক দলের এ বৈঠক রাতেও অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত দলগুলো পৃথকভাবে এক বক্স নীতিতে অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আলোচনার বাইরেও ভিন্ন খবর ও গুঞ্জন রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনসহ দু-একটি দল এ আসন সমঝোতা থেকে বের হয়ে যেতে পারে। তারা পৃথক ইসলামী জোট গঠনেরও চেষ্টায় আছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবার দেশে মূলত বিএনপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন দু’টি আলাদা জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ইতোমধ্যে আসন সমঝোতা সেরে ফেলেছে। তবে শরিকদের ছেড়ে দেয়া আসনগুলোতে এখনো বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন, যা তাদের এখন চরম মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমঝোতাভিত্তিক জোট এখনো তাদের আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি। গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। অন্য দিকে ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দিনভর তাদের দলীয় শীর্ষ ফোরামের বৈঠক করেছে। এসব বৈঠক চলাকালে এমনকি আগের দিন রাত থেকেই খবর ছড়াতে থাকে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তবে দিনভর বৈঠক শেষে ইসলামী আন্দোলন ঘোষণা করেছে তারা এখনো এক বক্স নীতিতে অটল রয়েছে। আর খেলাফত মজলিস আসন সমঝোতা নিয়ে তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছে। তবে জোটে থাকার ঘোষণা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এখনো জোটের ঐক্য অটুট রয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে তারাও ইসলামী আন্দোলনের সাথে জোট থেকে বের হয়ে যেতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এর সাথে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাইরে থাকা আরো কিছু দল নিয়ে আলাদা ইসলামী জোট গঠনের চিন্তাও রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে জামায়াত জোটে থাকা না থাকা নিয়ে দুই ভাগ হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এক ভাগ জোটে থাকার পক্ষে থাকলেও আরেকটি পক্ষ জোট ছাড়ার জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। গতকাল দিনব্যাপী জরুরি বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান যে জাতীয় সরকার গঠনের আলাপ করেছেন সেটা তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গাজী আতাউর রহমান প্রশ্ন রেখে বলেন, তাহলে কি জামায়াতে ইসলামী জাতীয় পার্টির মতো ভূমিকা পালন করবে? জাতীয় পার্টি যেমন আওয়ামী লীগের সাথে সরকারেও ছিল আবার বিরোধী দলেও ছিল। তবে কি এই জাতীয় কোনো ডিজাইনে তারা যাচ্ছেন? এটা নিয়েও আমাদের মধ্যে একটা শঙ্কা আছে। এরআগে এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জানায়, ইসলামপন্থীদের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় নিয়ে আমাদের পারস্পরিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক মহল, সাংবাদিক ও দেশপ্রেমিক জনগণ ইসলামপন্থীদের একবক্স নীতি নিয়ে যে আগ্রহ ও প্রত্যাশা প্রকাশ করছেন, তা দেশ ও ইসলামের জন্য অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক। ইনশা আল্লাহ জাতির সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে। আমাদের পারস্পরিক আলোচনা চলমান। ইনশা আল্লাহ দ্রুতই একবক্স নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার হবে। বৈঠকে দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমসহ শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

খেলাফত মজলিস গতকাল রাজধানীর একটি মিলনায়তনে দিনব্যাপী শূরার জরুরি অধিবেশন করেছে। সভা শেষে সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে তারা জানায়, জাতির প্রত্যাশা পূরণে ১১ দলীয় ঐক্য অটুট রাখতে হবে। তবে ঐক্য অটুট রাখার স্বার্থে ন্যায্যতার ভিত্তিতে আসন সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন। এ সময় দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এক আসনে একটি ইসলামী দলের প্রার্থী নিয়ে যে নির্বাচনী সমঝোতা বা ওয়ান বক্স পলিসি তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন খেলাফত মজলিস মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে, ১১ দলের শরিকদের সাথে সর্বশেষ আলোচনায় খেলাফত মজলিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী ও অঞ্চল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে, যা শুধু খেলাফত মজলিসের জন্যই নয় জোটের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রতিটি বিভাগে খেলাফত মজলিসের জন্য ন্যূনতম প্রতিনিধিত্বের স্বার্থে আসন সমঝোতা ইনসাফের দাবি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও সিনিয়র নেতাদের নিয়ে গতকাল বৈঠক করেছে। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছু কারণে এখনো সমঝোতা আটকে আছে। তবে এখনো আমরা আশাবাদী জোট অটুট থাকবে।

জামায়াতে ইসলামীও এখনো সমঝোতার আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কিছু সমস্যা থাকায় সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। ওই কারণ সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে লিয়াজোঁ কমিটি বৈঠক করেছে। তারা চেষ্টা করছেন সমাধানের জন্য। আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যেই সমাধান হয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিকে জানাতে পারব। এ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের গতকালের এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান কারো ব্যাপারেই কোনো ধরনের বিরূপ আচরণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। জামায়াত আমির লেখেন, ‘বহু ত্যাগ এবং কোরবানির সিঁড়ি বেয়ে প্রিয় সংগঠন ও জাতি মহান আল্লাহ তায়ালার একান্ত মেহেরবাণীতে এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।’ সময়টা জাতীয় জীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক উল্লেখ করে তিনি আরো লেখেন, ‘এ সময়ে সবাইকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কারো ব্যাপারেই কোনো ধরনের বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।’ সবাই সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সবাই সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবো, ইনশা আল্লাহ।

এ দিকে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদী এক বিবৃতিতে ‘নির্বাচনের আগেই জামায়াতের পরাজয়......’ শিরোনাম দিয়ে বলেন, জোট রক্ষায় আপস করে ১৯০ আসনের কম আসনে নির্বাচন করলে নির্বাচনের আগেই জামায়াতের পরাজয় হয়ে যাবে। দাঁড়িপাল্লার প্রতি তরুণ, শিক্ষিত ও সাধারণ ভোটারদের ব্যাপক আগ্রহ ইতোমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ জোয়ারে ভাটা পড়বে এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া জামায়াতের জন্য ফলপ্রসূ হবে না বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। নিজেদের মর্যাদা অক্ষুণœ রেখে সিদ্ধান্ত নিতে জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।