বিএনপির মাথাব্যথা বিদ্রোহী প্রার্থী

বাগে আনার চেষ্টা চলছে অন্যথায় বহিষ্কার

কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত না মেনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন বিএনপির অনেক নেতা। এরই মধ্যে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জোট এবং ধানের শীষের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ায় ৯ জনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। জানা গেছে, অন্যান্য আসনেও যারা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে দল। তবে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগের কথা বিবেচনায় তাদের ব্যাপারে দল এখনো নমনীয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা করবে বিএনপি।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বিএনপির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীরা। দলটি ইতোমধ্যে এসব প্রার্থীর তালিকা করেছে। জানা গেছে, প্রথমত এদেরকে বুঝিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করানো হবে। যদি সেটি না হয় তা হলে বহিষ্কারের পথ বেছে নেয়া হবে। তবে বিএনপির শরিক দলগুলো বলেছে, কেবল বহিষ্কার নয়, মনোনীত প্রার্থীর বাইরে জনগণের কাছে ‘বিএনপির নেতা’ হিসেবে পরিচিত, এমন কাউকে মাঠে রাখা যাবে না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও শরিকদের তরফ থেকে এই বার্তা দেয়া হয়েছে।

কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত না মেনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন বিএনপির অনেক নেতা। এরই মধ্যে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জোট এবং ধানের শীষের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ায় ৯ জনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। জানা গেছে, অন্যান্য আসনেও যারা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে দল। তবে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগের কথা বিবেচনায় তাদের ব্যাপারে দল এখনো নমনীয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা করবে বিএনপি। এ জন্য প্রাথমিকভাবে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও তাদের সাথে বসবেন। এ ক্ষেত্রে আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দেখবে বিএনপি। তার পরও নির্বাচনের মাঠে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে দল।

বিএনপির প্রত্যাশা, দলের এমন উদ্যোগে অধিকাংশ স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হবে। এ দিকে স্বতন্ত্র বা অন্য কোনো ব্যানারেও বিএনপির নেতারা নির্বাচনের মাঠে থাকুক, সেটা চান না বিএনপির সাথে আসন সমঝোতা হওয়া যুগপৎ জোটের প্রার্থীরা, সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী যারা তাদের নিজেদের প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তারা বলছেন, জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক শক্তি বিবেচনায় বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল। সেই দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকলে, সেটা তাদের জন্য ফল বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের সব মনোনয়ন প্রক্রিয়া যখন শেষ হয়ে যাবে, তার আগ পর্যন্ত আমরা দেখব। এর পর যদি কেউ থাকে, তাদের ব্যাপারে দল তখন সিদ্ধান্ত নেবে। একেবারে কঠিন সিদ্ধান্ত খুব সহজে তো আমরা নিতে পারি না, বিএনপি গণতান্ত্রিক একটা দল। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সাথে সমঝোতা করে আমরা কিছু আসন ছেড়ে দিয়েছি, যদিও ওই আসনগুলো বিএনপির জন্য একবারে বিজয়ী হওয়ার মতো আসন। এখনো যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী আছে, সেসব জায়গায় ধানের শীষও আছে। তাদেরকে আমরা আগামী ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেখব, তাদের বোঝাব। তার পরেও তারা যদি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করে, তখন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ১৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে পাঁচটি (নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত অংশ মিলিয়ে), গণতন্ত্র মঞ্চকে তিনটি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটকে একটি, গণঅধিকার পরিষদকে একটি আসন ছেড়েছে। এদের মধ্যে নিবন্ধিত শরিকরা তাদের নিজেদের প্রতীকে নির্বাচন করবে। আর অনিবন্ধিত শরিকরা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করবে। সমঝোতা অনুযায়ী, বিএনপি সেখানে তাদের দলীয় প্রার্থী দেবে না। এ ছাড়া বিজয় নিশ্চিতে কৌশলের অংশ হিসেবে শরিক কয়েকটি দলের নেতাদের বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ধানের শীষ দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দু-তিনজন নিজেদের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করেছেন।

সমঝোতা অনুযায়ী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঢাকা-১২; গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬; নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২; গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩; জমিয়তের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক সিলেট-৫, সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী নীলফামারী-১ এবং কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীকে ভোট করছেন। এ ছাড়া ১২ দলীয় জোটভুক্ত ‘অনিবন্ধিত’ জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব রশিদ বিন ওয়াক্কাস যশোর-৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। অন্য দিকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪, এলডিপির রেদোয়ান আহমদ কুমিল্লা-৭, বাংলাদেশ এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১, বাংলাদেশ জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ থেকে ধানের শীষে ভোট করবেন। এ ছাড়া বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ থেকে নির্বাচন করবেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সাইফুল আলম নীরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও তরুণ দে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে কৃষক দলের মেহেদী হাসান পলাশ, পটুয়াখালী-৩ আসনে হাসান মামুন, ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বহিষ্কৃত হয়েছেন।

এ দিকে গতকাল শরিক দলের এক নেতা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। জানা গেছে, তার আসনে থাকা বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী যাতে কোনোভাবেই নির্বাচনের মাঠে না থাকেন, সে ব্যাপারে তারেক রহমানের সাথে কথা বলেন তিনি।

জানতে চাইলে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত যুগপৎ জোটের প্রার্থী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা চাইব- বিএনপির সাথে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা নিজেদের দলীয় প্রতীকে যেসব আসনে নির্বাচন করছেন, সেখানে কোনো ব্যানারেই যেন বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকেন। কারণ, এতে করে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়, ভোটারদের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিজেদের মধ্যে কোনো বিভাজন-অনৈক্য নয়, সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, বেশ কিছু আসনে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে যেমন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে, তেমনি আসন সমঝোতার ভিত্তিতে শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয়া আসনেও বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে। আমরা আশা করি, বিএনপির হাইকমান্ড তাদের সবাইকে ডাকবেন এবং আলোচনা করে তারা যাতে বিএনপি ও বিএনপি সমর্থিত জোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেন, সে ব্যাপারে দলের হাইকমান্ড প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবেন। এ দিকে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শতাধিক আসনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হন দলের নেতারা। যাচাই-বাছাইয়ের পর এখনো অর্ধ-শতাধিক আসনে তারা মাঠে রয়েছেন। তাদের দাবি- জনগণের চাওয়াকে মূল্যায়ন করতেই তারা নির্বাচন করতে চান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, একজন রাজনীতিবিদ যখন মানুষের কাছ থেকে তার ফল পাওয়া শুরু করে, তখন কোনো দল বা গোষ্ঠী তাকে এনডোর্স করলো কি না, তাতে কিছু যায়-আসে না।

কুমিল্লা-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ মতিন বলেন, আমি এসেছি জনগণের জন্য, জনগণের পক্ষে, জনগণের শোর্য-বীর্য রক্ষার জন্য।

নাটোর-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, দল দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেবে জেনেই মানুষের সেন্টিমেন্ট অনুযায়ী নির্বাচনের মাঠে আছি। দলের একটা পদে আছি, দল থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলে এই পদেও থাকব না। কিন্তু দলের নীতি-আদর্শ থেকে তো আমাকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

কুমিল্লা-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিনুর রশিদ ইয়াসিন বলেন, আমি সারা জীবন বিএনপির কর্মী ছিলাম, এখনো আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। আর নির্বাচনে বিজয়ী হলে বিএনপির কাছেই চলে যাব।