নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারী (ইআরএল) কাঁচামাল (ক্রুড) সঙ্কটে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি যেকোনো সময় ইআরএল বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আভাস মিলেছে। ফলে সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রলের বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে দেশের পেট্রল ও অকটেনের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেকের জোগানদাতা রাষ্ট্রায়ত্ত দু’টি ও বেসরকারি চারটি কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্লান্টের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে বিপিসি সূত্র জানিয়েছে। এর বাইরে পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে আমদানি করা ২৫ হাজার টন অকটেনের চালান দেশে আসার কথা রয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসের মাঝামাঝি এক লাখ টন ক্রুড অয়েল এবং অকটেনের আরো একটি চালান দেশে পৌঁছার কথা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। পেট্রোবাংলার একটি সূত্র অবশ্য গ্যাস ফিল্ডগুলো হতে কনডেনসেট উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার তথ্যও জানিয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের পর হতেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কটে ভুগছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে কেউ মুখ না খুললেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবহারযোগ্য অপরিশোধিত তেলের মজুদ ১০ হাজার মে.টনের কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা দিয়ে মাত্র দু-তিন দিন কার্যক্রম চালানো সম্ভব। বর্তমানে রিফাইনারিতে অনেকটা ধীরে ধীরে বন্ধ করার প্রক্রিয়ার মতোই খুবই ধীরগতিতে পরিশোধন কার্যক্রম চলছে বলেও সূত্র জানায়।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে এই তেল শোধনাগারে তা পরিশোধন করা হয়। গত মার্চ মাসে মোট দুই লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আসার কথা থাকলেও সেই চালান দু’টি সময়মতো না পৌঁছাতেই এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ক্রুডের মজুদ একেবারেই শেষের পথে রয়েছে বলেও সূত্র জানায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইআরএল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু ‘লাইট ক্রুড’ শোধনের উপযোগী করে তৈরি করা। ফলে অন্য কোনো উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করা কঠিন। ইতঃপূর্বে করোনার সময় রাশিয়ান ক্রুড অয়েল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা ইআরএল-এ পরিশোধন উপযোগী নয় বলে জানানো হয়েছিল।
সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে দুই দেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের দু’টি ট্যাংকার বাংলাদেশে আসে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত তিনটি ট্যাংকার আসেনি। এর মধ্যে একটি ট্যাংকারে তেলবোঝাই করা হয়েছে এবং সেটি এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসার পথে রয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একটি সূত্র জানিয়েছে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এক লাখ মে.টন ক্রুড তেলের একটি জাহাজ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সে জন্য সপ্তাহ খানেকের জন্য রিফাইনারি বন্ধ হলেও তা জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবেনা বলেও সূত্র দাবি করেছে।
তবে অন্য একটি সূত্র সেচ মৌসুমে রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বড় ধরনের হোঁচট হিসেবে মন্তব্য করেছেন। ওই সূত্রমতে, সরকার দ্রুত সেচব্যবস্থা সচল রাখতে বিকল্প উৎস থেকে ডিজেলের জোগান দিতে না পারলে দেশে মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইআরএল মূলত একটি ফুয়েল রিফাইনারি হিসেবে সীমিত কলেবরে স্থাপিত হলেও পরবর্তীকালে দেশের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু নতুন ইউনিট সংযোজনের মাধ্যমে বর্তমানে কিছু নন-ফুয়েল পণ্যসহ লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), স্পেশাল বয়েলিং পয়েন্ট সলভেন্ট (এসবিপি), মোটর গ্যাসোলিন রেগুলার (পেট্রোল), মোটর গ্যাসোলিন প্রিমিয়াম (অকটেন), ন্যাফথা (গ্যাসোলিন), মিনারেল টার্পেনটাইন (এমটিটি), সুপিরিয়র কেরোসিন অয়েল (এসকেও), জেট এ-১ (এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল), হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি), জুট ব্যাচিং অয়েল (জেবিও), লাইট ডিজেল অয়েল (এলডিও), ফার্নেস অয়েল (এফও) এবং বিটুমিন উৎপাদন করছে।
বিদেশ থেকে কনডেনসেট আনছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা
এ দিকে পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী দেশের গ্যাস ফিল্ডগুলো হতে বর্তমানে দৈনিক পাঁচ হাজার ব্যারেলের কাছাকাছি কনডেনসেট উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে দেশের কনডেনসেটের উৎপাদন ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলেও সূত্র জানায়। তা ছাড়া পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কোম্পানিগুলো এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (আইওসি) ফিল্ডগুলোতে উৎপাদিত কনডেনসেট সরকারি ফ্রাকশনেশন প্লান্টগুলোতে সরবরাহের পর উদ্বৃত্ত থাকলেই বেসরকারি ফ্লান্টে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে কনডেনসেটের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বেসরকারি প্লান্টগুলো চাহিদা মোতাবেক কনডেনসেট পাচ্ছে না বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে কনডেনসেট আমদানি করে অকটেন ও পেট্রলের জোগান দিচ্ছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। দু’দিন আগে চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি মালয়েশিয়া থেকে ৩৮ হাজার টন কনডেনসেট পাঁচ হাজার টন এমটিবি আমদানি করেছে বলে জানা গেছে। যা পরিশোধন শেষে অকটেন ও পেট্রল হিসেবে দ্রুতই বাজারে আসবে।
দেশেীয় গ্যাসফিল্ডের কনডেনসেট থেকেই আসে ৪৫ শতাংশ অকটেন ও পেট্রল।
বাংলাদেশের নিজস্ব কনডেনসেট থেকে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করে সরকারি কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দু’টি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি।
পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কোম্পানিগুলো এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (আইওসি) ফিল্ডগুলোতে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকেই দেশের মোট পেট্রল ও অকটেনের চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ জোগান হয় বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে। বাকি চাহিদা ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড পরিশোধন এবং বেসরকারি কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্লান্টগুলো বিদেশ থেকে কনডেনসেট আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে।
সবচেয়ে বেশি পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল এবং অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদন করে হবিগঞ্জের সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) রশিদপুর ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট বা সিআরইউ।
হবিগঞ্জের প্লান্টে বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট পরিশোধন করে ৬০০ ব্যারেল অকটেন, তিন হাজার ৪৫০ ব্যারেল পেট্রল, ১৫০ ব্যারেল ডিজেল ও ১০০ ব্যারেল কেরোসিন এবং ১৭ ব্যারেল এলপিজি উৎপাদন হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্লান্টের মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল (প্রা:) লিমিটেড, চট্টগ্রাম; এ্যাকোয়া রিফাইনারি লি., নরসিংদী; পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড (পিপিএল), চট্টগ্রাম এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড (পিআরএল) মোংলা কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রল ও অকটেন বাজারে সরবরাহ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫৯৭.৩৭২ মে.টন গ্যাস কনডেনসেট ইস্টার্ন রিফাইনারি ক্রুড অয়েলের সাথে মিশ্রণ করে কনডেনসেট ফ্রাকশনেসন প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করেছে। ইআরএল ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার মে.টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াকরণ করে বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করেছে। উৎপাদিত পণ্যের ১৬ শতাংশই পেট্রল ও অকটেন বলে সূত্র জানায়।
এ ছাড়া বছরজুড়ে জাতীয় এবং পিএসসি-পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে কনডেনসেট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল গত অর্থবছরে ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেল। এসব কনডেনসেট অপ্টিমাইজড প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে অন্যান্য জ্বালানি তেলের পাশাপাশি দেশের মোট পেট্রলের চাহিদার বেশির ভাগ সোয়া তিন লাখ মে.টন এবং প্রায় ৬০ হাজার মে.টনের বেশি অকটেন উৎপাদন করা হয় বলে সূত্র জানায়। সূত্রমতে, দেশে পেট্রলের বার্ষিক চাহিদা পাঁচ লাখ মে.টনের কাছাকাছি। আর অকটেনের চাহিদা সাড়ে চার লাখ মে.টনের কাছাকাছি।
প্রসঙ্গত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বিপিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত মোট জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল ৬৮.৩৫ লাখ মেট্রিক টন। এসব জ্বালানি তেলের মধ্যে ৬২.৬৯ শতাংশ ডিজেল, ১৪.৩৪ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৬.৩২ শতাংশ পেট্রোল, ৫.৯০ শতাংশ অকটেন, ১.০০ শতাংশ কেরোসিন, ৮.১৯ শতাংশ জেট এ-১ এবং ১.৫৬ শতাংশ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে বিপিসি, ইস্টার্ন রিফাইনারি কিংবা সিলেট গ্যাস ফিল্ডের কর্মকর্তাদের ফোন করা হলেও কোনো কর্মকর্তাই ফোন রিসিভ করেননি।
তবে ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, ইআরএল-এ যে মজুদ আছে তা দিয়ে হয়তো দু’দিনের মতো চলবে। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি ক্রুড নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। রিফাইনারি একবার বন্ধ হলে আবার চালু করতে মাঝখানে এক দিন পর্যন্ত সময় লাগে বলেও তিনি জানান।



