সংসদ সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকা : স্থানীয় সরকার ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে?

জাতীয় বনাম স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন, জাতীয় নীতি নির্ধারণ এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্য দিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন- সরাসরি স্থানীয় উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় সংসদ সদস্য (এমপি) এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন, জাতীয় নীতি নির্ধারণ এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্য দিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন- সরাসরি স্থানীয় উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

তবে বাস্তবে দেখা যায়, এ দুই স্তরের ক্ষমতার সীমারেখা প্রায়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়। সংসদ সদস্যরা প্রায়ই স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা, স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বনাম সংসদ সদস্য : ভূমিকার মৌলিক পার্থক্য

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল দায়িত্ব হলো- জনগণের দৈনন্দিন সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাস্তাঘাট নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে স্থানীয় উদ্যোগ- এসব বিষয়েই তাদের কাজ কেন্দ্রীভূত থাকে।

অন্য দিকে সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, বাজেট প্রণয়ন ও জাতীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। তারা নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করলেও তাদের সিদ্ধান্ত কার্যত পুরো দেশের জন্য প্রযোজ্য।

অর্থাৎ, স্থানীয় সরকার প্রধানরা সরাসরি স্থানীয় শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন, আর সংসদ সদস্যরা জাতীয় আইনপ্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন। তবে উভয়েই জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় অনেক সময় ক্ষমতার ক্ষেত্র নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

উন্নয়ন প্রকল্পে এমপিদের প্রভাব : বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু

নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পে সংসদ সদস্যদের প্রভাব এবং তহবিল ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।

সমর্থকদের মতে, সংসদ সদস্যদের সরাসরি তদারকি উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সহায়ক এবং এতে জনগণের কাছে জবাবদিহি বাড়ে।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ হস্তক্ষেপ স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা খর্ব করে এবং দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং স্থানীয় সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

রাজনীতিবিষয়ক লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার এক নিবন্ধে দেখিয়েছেন, কিভাবে অনেক সংসদ সদস্য অধিকাংশ সময় ঢাকায় বসবাস করলেও নিজ এলাকায় শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখেন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা- স্থানীয় ঠিকাদারি ও ইজারাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পদ নিজেদের অনুগতদের মাধ্যমে দখলে রাখেন; স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে আধিপত্য বিস্তার করেন।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, অনেকেই সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর সেই পদ ব্যবহার করে বহুগুণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।

অথচ সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। স্বাধীনভাবে কোনো বিল উত্থাপনের উদাহরণও বিরল।

স্থানীয় সরকার বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আল মামুন মনে করেন, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন ‘আজ অনেক সংসদ সদস্যের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন নয়; বরং রাস্তা, টেন্ডার, প্রকল্প, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। ভোটাররাও তাদের কাছ থেকে নীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধান আশা করেন।’

তার মতে, এর ফলে সংসদ সদস্যরা জাতীয় নীতিনির্ধারক না হয়ে স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছেন।

সংবিধান যা বলে

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত। অর্থাৎ জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মঞ্চ হওয়া উচিত সংসদ।

অন্য দিকে ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর স্থানীয় শাসনের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এ সাংবিধানিক কাঠামোর পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় না।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা অনেকটা ‘কেতাবে আছে, বাস্তবে নেই’- এমন অবস্থার মতো।

স্থানীয় সরকার কেন শক্তিশালী হচ্ছে না

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং তাদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম।

তবে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেন- স্থানীয় সরকার কর্মকর্তারা কতটা প্রশাসনিক সহযোগিতা পাচ্ছেন? স্থানীয় সরকার পরিষদ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কতটা? স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ কতটা?

তার মতে, বিশ্বজুড়ে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

বিকল্প মডেল : নির্বাচনী এলাকা পুরো দেশ?

এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান ড. নজরুল ইসলাম ভিন্ন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, সংসদ সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সাথে যুক্ত না রেখে তাদের নির্বাচনী এলাকা পুরো দেশ হওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন- ‘সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করেন গোটা দেশের জন্য, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়। তাই তাদের দায়িত্বও জাতীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।’

তিনি মনে করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় প্রভাব কমবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে।

সুজনের পর্যবেক্ষণ

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম বড় সঙ্কট সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত প্রভাব। তিনি উল্লেখ করেন- ‘অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা শুধু সুপারিশই করেন না; উন্নয়ন প্রকল্পসহ স্থানীয় প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন।’

তার মতে, অনেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য উপজেলা পরিষদ পরিচালনায় সরাসরি ভূমিকা রাখেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের কাজেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, বাস্তবে এমন কোনো উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায় যেখানে কোনো কর্মকর্তা সংসদ সদস্যের সুপারিশ উপেক্ষা করার সাহস দেখিয়েছেন।

দ্বৈত ক্ষমতার সঙ্কট

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদ সদস্যরা এক ধরনের দ্বৈত ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তারা একই সাথে জাতীয় আইনপ্রণেতা এবং স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছেন। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

শেষ কথা : সংস্কার কি সম্ভব?

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় কার্যকর ভারসাম্য আনতে হলে সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকার স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সংসদ সদস্যদের যদি প্রধানত জাতীয় আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে মনোনিবেশ করানো যায় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন করা যায়, তবে স্থানীয় উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যথায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।