রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝে বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব বাড়লেও কমছে আস্থা

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়লেও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই নিয়ে বাস্তব চিত্র একমুখী নয়। এক দিকে নির্বাচন-পূর্ব অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রাখছে, অন্য দিকে সরকারি সংস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু খাতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ বেড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবও আসছে। তবে প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশী বিনিয়োগের বাস্তবতা আসলে কতটা ইতিবাচক, আর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচন-পূর্ব উত্তাপের মধ্যেও দেশে বিদেশী বিনিয়োগ পুরোপুরি থমকে যায়নি। নতুন এফডিআই প্রস্তাবের সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত মিললেও বাস্তব বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এখনো স্পষ্ট। এক দিকে সরকার ও বিনিয়োগ বোর্ড সম্ভাবনার কথা বলছে, অন্য দিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত জটিলতা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার চাপ বিদেশী উদ্যোক্তাদের অপেক্ষমাণ অবস্থানে রাখছে এমন দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের চিত্র ধরা পড়ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়লেও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই নিয়ে বাস্তব চিত্র একমুখী নয়। এক দিকে নির্বাচন-পূর্ব অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রাখছে, অন্য দিকে সরকারি সংস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু খাতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ বেড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবও আসছে। তবে প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশী বিনিয়োগের বাস্তবতা আসলে কতটা ইতিবাচক, আর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকৃত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি হলেও মোট জিডিপির মাত্র ২-৩ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানিসঙ্কট এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকৃত বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক হলেও সরকার ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতির উদ্যোগ নিয়েছে।

তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে নিট বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ সময়ে নেট এফডিআই প্রায় ১.০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগ এবং মূল কোম্পানি থেকে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ঋণ বা ইন্ট্রা-কোম্পানি লোনের মাধ্যমে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও সামগ্রিক চিত্রে প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী থাকায় সরকার ও নীতিনির্ধারকরা এটিকে ইতিবাচক সঙ্কেত হিসেবে দেখছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জাতিসঙ্ঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে নিট এফডিআই কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সঙ্কট, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থার চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে ওই সময়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের শুরুতে প্রবাহ বৃদ্ধিকে অনেক বিশ্লেষক ‘টেকনিক্যাল রিকভারি’ হিসেবে দেখছেন, যার স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতার ওপর।

নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব সাধারণত সতর্ক থাকে এটি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেখা গেছে, নির্বাচন সামনে এলে বড় আকারের নতুন বিদেশী বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত অনেক প্রতিষ্ঠান স্থগিত রাখে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগের তুলনায় ব্রাউনফিল্ড বা বিদ্যমান প্রকল্প সম্প্রসারণে বিনিয়োগের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে; অর্থাৎ নতুন কারখানা স্থাপনের বদলে বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো বা প্রযুক্তি হালনাগাদে বেশি অর্থ ঢুকছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়েছে। এ সময়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। মোট নিবন্ধিত শিল্প প্রকল্পের সংখ্যা শতাধিক, যার একটি অংশ পুরোপুরি বিদেশী মালিকানাধীন এবং আরেকটি অংশ যৌথ উদ্যোগ। যদিও প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ও বাস্তবায়িত বিনিয়োগের মধ্যে বড় পার্থক্য থেকে যায়, তবুও এ প্রবণতাকে সরকার সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।

খাতভিত্তিক বিনিয়োগ প্রবণতায় কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল খাত বিদেশী বিনিয়োগের বড় অংশ দখল করে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও আইটি-সার্ভিস, এগ্রো-প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই), মেডিক্যাল ডিভাইস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও রফতানি সম্ভাবনা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। একইভাবে ডিজিটাল অর্থনীতি ও স্টার্ট-আপ খাতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগের আগ্রহও ধীরে ধীরে বাড়ছে, যদিও পরিমাণ এখনো সীমিত।

অন্য দিকে কিছু খাতে বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যাওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় আকারের নতুন বিদেশী বিনিয়োগ তুলনামূলক কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি নীতির অনিশ্চয়তা, মূল্য সমন্বয়সংক্রান্ত জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাস্তবায়নের ঝুঁকি এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। একইভাবে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কাঠামোয় বিদেশী বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।

নির্বাচনকে সামনে রেখে বিনিয়োগকারীদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা। ডলার সঙ্কট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং মুনাফা দেশে ফেরত পাঠানোসংক্রান্ত প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ ও সহজ হয়নি এমন অভিযোগ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক ধাপে ধাপে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার উদারীকরণ ও রফতানিমুখী শিল্পে বিশেষ সুবিধা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও বাস্তব পর্যায়ে আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন-পূর্ব সময়েও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। বিডা সম্প্রতি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে বিনিয়োগ মানচিত্র বা ‘এফডিআই হিটম্যাপ’ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যক্রম জোরদার, কর অবকাশ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রফতানি প্রণোদনার মতো সুবিধা বহাল রাখার কথাও জানানো হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচন-পূর্ব সময়ে বিদেশী বিনিয়োগের বর্তমান চিত্রকে অতিরিক্ত আশাবাদ বা অতিরিক্ত হতাশা কোনোটির মধ্যেই ফেললে চলবে না। সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি আংশিকভাবে ইতিবাচক হলেও তা এখনই দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দেয় না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এই চারটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করছেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন-পূর্ববর্তী বাস্তবতায় বিদেশী বিনিয়োগের চিত্র একটি মিশ্র প্রতিফলন। নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব ও কিছু খাতে প্রবাহ বৃদ্ধির তথ্য আশার আলো দেখালেও কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীল সরকার ও স্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ থাকলে বিদেশী বিনিয়োগে টেকসই গতি ফিরতে পারে এমন প্রত্যাশাই এখন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের।