জাতীয় তিন নেতার মাজার

নাসিম সিকদার
Printed Edition
জাতীয় তিন নেতার মাজার
জাতীয় তিন নেতার মাজার

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততা আর কোলাহলের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দোয়েল চত্বরের উত্তর কোণে ও শিশু একাডেমি সংলগ্ন এক নীরব ও গম্ভীর স্থানে দাঁড়ালে যেন সময় থমকে যায়। হাইকোর্ট সংলগ্ন এই স্থানে অবস্থিত সুউচ্চ সমাধিসৌধটি সাধারণ মানুষের কাছে ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত হলেও বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না এখানে কারা শায়িত আছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক বিভাগের নথিতে এটি ‘জাতীয় তিন নেতার মাজার’ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এটি কেবল একটি সমাধিস্থল নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

এই মাজারে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলার তিন সূর্যসন্তান : ১. অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), যিনি ‘শেরে বাংলা’ নামে খ্যাত এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন অগ্রণী। ২. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩) : প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী; গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩. সৈয়দ নজরুল ইসলাম (১৯২৫-১৯৭৫): তিনি ১৯৭১ সালের কঠিন সময়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রবাসী সরকার পরিচালনা করেন।

১৯৬২ সালে এ কে ফজলুল হক এবং ১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এখানে সমাহিত করার পর থেকেই এই স্থানটি জাতীয় গুরুত্ব লাভ করতে শুরু করে। তবে বর্তমানের সুউচ্চ ও আধুনিক সমাধিসৌধটি নির্মাণের মূল সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৯৭৭ সালে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার হাইকোর্ট সংলগ্ন এই স্থানে দেশের মরহুম তিন নেতার সমাধিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। সমাধিসৌধটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক বিভাগের তত্ত্বাবধান ও অর্থায়নে নির্মিত হয়। ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে শেষ হয়। ৫২ ফুট উচ্চতার এই স্থাপত্যটি একটি কংক্রিটের বেদির ওপর অবস্থিত, যার আয়তন ১৬ হাজার ৮৩৬ বর্গফুট। এর আকাশমুখী তিনটি স্বতন্ত্র অথচ পরস্পর সংযুক্ত খিলান তিন নেতার স্মৃতি, আদর্শ ও ঐক্যের প্রতীক। ১৯৮৫ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে এই তিন নেতার অবদান অনন্য। বিভিন্ন বিশেষ দিনগুলোতে এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সেখানে একজন সার্বক্ষণিক খাদেম ও চৌকিদার রয়েছেন। তবে সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, অনেক সময় মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় সাধারণ দর্শনার্থীরা মাজার কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকতে পারেন না। এই ঐতিহাসিক স্থানের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা রক্ষায় আরো নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখানে একটি আধুনিক তথ্যকেন্দ্র বা আর্কাইভ স্থাপন এখন সময়ের দাবি, যাতে নতুন প্রজন্ম এই তিন নেতার সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে পারে।

জাতীয় তিন নেতার মাজার কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি জাতির কৃতজ্ঞতা ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। এই তিন নেতার আদর্শ, ঐক্য এবং গভীর দেশপ্রেম আজো আমাদের পথ দেখায় এবং একটি উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে অনুপ্রাণিত করে।