২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ছিল বেদনাদায়ক সত্য প্রকাশের বছর। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসলাম মজুমদার, শিকদার গ্রুপসহ একশ্রেণীর লুটেরা দেশের ব্যাংক খাত থেকে মহালুটপাটে নেমেছিল। জনগণের আমানত নানা কৌশলে বের করে নিলেও তা প্রকাশ না করে গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিদায়ী বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃঢ়তার কারণে তা প্রকাশ করা হয়। ফলে তিন মাস বাকি থাকতেই সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এ জন্য এ খাতের জন্য ছিল একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে নীতিগত সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বছর। বছরের শুরুতে যে খাতটি খেলাপি ঋণ, তারল্য সঙ্কট, সুশাসনের ঘাটতি ও আস্থাহীনতার বোঝা বইছিল, বছর শেষে সেখানে নিয়ন্ত্রণমূলক কঠোরতা, নীতিগত পুনর্বিন্যাস এবং কাঠামোগত সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়। যদিও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি, তবুও ২০২৫ সাল ব্যাংকিং খাতকে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’-এর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
খেলাপি ঋণ : বড় সঙ্কট, বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক ইস্যু ছিল খেলাপি ঋণ। বছরের শুরুতেই সরকারি ও কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক চিত্র সামনে আসে। বিশেষ করে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ৩০-৩৫টি গ্রাহকের কাছেই আটকে পড়ে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ, যা ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রক মূলধনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে বিশেষ করে ব্যাংক ডাকাত এস আলমের নিয়ন্ত্রণে নেয়া ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ প্রায় দেড় ডজন ব্যাংকের বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের চিত্র বের হয়ে আসে। এসব ব্যাংকের কোনো কোনোটির খেলাপি ঋণ ৯৮ শতাংশে উঠেছে। স্বৈরাচারের আমলে এসব ঋণ লুকানো হতো। প্রকাশ্যে আনতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বারণ করা হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকোনোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে ‘বাস্তবভিত্তিক শ্রেণিকরণ’ জোরদার করে। ঋণ পুনঃতফসিল ও অবলোপনের ক্ষেত্রে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। ফলে বছরজুড়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা স্বল্পমেয়াদে অস্বস্তি বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতার পথ তৈরি করেছে।
ব্যাংক রেজুল্যুশন ও একীভূতকরণ আলোচনা
২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ব্যাংক রেজুল্যুশন কাঠামো বাস্তব আলোচনায় আসে। আর্থিকভাবে দুর্বল কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘রেজুল্যুশন প্ল্যান’ প্রস্তুতের কাজ শুরু করে। এর মধ্যে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন একটি ইসলামী ব্যাংকের আত্মপ্রকাশ ঘটানো হয়। এতে প্রয়োজনে একীভূতকরণ (মার্জার), ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন কিংবা বিশেষ তত্ত্বাবধানের পথ খোলা রাখা হয়। এ বছরই ব্যাংক রেজুল্যুশন আইন ও বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, যা ভবিষ্যতে দুর্বল ব্যাংক সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আইনি শক্তি দেবে। এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা ব্যাংকিং খাত সংস্কারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তারল্য সঙ্কট ও ইসলামী ব্যাংকিং চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট প্রকাশ্য রূপ নেয়। আমানত প্রত্যাহারের চাপ, আন্তঃব্যাংক বাজারে অনাস্থা এবং অতীতের অনিয়ম সব মিলিয়ে এই ব্যাংকগুলোর জন্য বছরটি ছিল কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ রিফাইন্যান্স, তারল্য সহায়তা ও কড়া তদারকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। একই সাথে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা তারল্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ও কেন্দ্রীয় শরিয়াহ বোর্ড শক্তিশালী করার আলোচনা এগিয়ে যায়।
ডলার সঙ্কট থেকে স্বস্তি, বিনিময় হার স্থিতিশীলতা
২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাত কিছুটা স্বস্তি পায় বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে। বছরের মাঝামাঝি থেকে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং রফতানি আয়ে স্থিতিশীলতা আসায় ডলার সঙ্কটের চাপ কমতে থাকে। সেপ্টেম্বর নাগাদ টাকার বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়। বছর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ দাঁড়িয়েছে মোট প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, আর প্রকৃত প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ক্রলিং পেগ’ ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ সীমিত রেখে ডলার বাজারকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার কৌশল নেয়। ফলে ব্যাংকগুলোর এলসি নিষ্পত্তি ও বৈদেশিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা কিছুটা বাড়ে।
সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও ঋণপ্রবাহ
২০২৫ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদহার তুলনামূলকভাবে কড়াকড়ি অবস্থায় থাকে। স্মার্ট সুদহার পুরোপুরি কার্যকর না থাকলেও বাজারভিত্তিক সুদের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হন নীতিনির্ধারকরা। এর প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে বিনিয়োগ কিছুটা শ্লথ থাকে, তবে বছর শেষে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সুশাসন, পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি : ২০২৫ সালে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন জোরদারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। একাধিক ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন, স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করে। একই সাথে ব্যাংক পরিদর্শন, স্পেশাল অডিট ও অনলাইন মনিটরিং জোরদার করা হয়, যা নিয়ন্ত্রকের সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
২০২৫ সালে সঙ্কটের মধ্যেও ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে অগ্রগতি অব্যাহত থাকে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (গঋঝ), ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল লেনদেন এবং স্মার্ট পেমেন্ট সিস্টেম আরো বিস্তৃত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা ও গ্রাহক সুরক্ষায় নতুন নির্দেশনা জারি করে।
সার্বিক মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল ‘বেদনাদায়ক সত্য প্রকাশের বছর’। সমস্যাগুলো লুকিয়ে না রেখে সামনে আনার চেষ্টা হয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে চাপ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে সংস্কারের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। খেলাপি ঋণ, তারল্য সঙ্কট ও সুশাসনের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হলেও রেজুল্যুশন কাঠামো, কঠোর তদারকি ও নীতিগত সংস্কার ২০২৬ সালের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। ২০২৫ তাই ইতিহাসে থাকবে এমন একটি বছর হিসাবে, যখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সঙ্কট স্বীকার করে সংস্কারের পথে হাঁটার সাহস দেখিয়েছে।



