- যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবেলায় সক্রিয় চীন
- মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে উভয় সঙ্কট
- ভারতের সাথে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন : মুন্সি ফয়েজ
ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে নতুন সরকার। এক দিকে চীন থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই বাংলাদেশকে তাগাদা দিচ্ছে। এই চাপ মোকাবেলা করে বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রাখতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে চীন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী মাসে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের চাইতে বেশি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ব্যবসার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পর্যালোচনার পক্ষে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদেশী পণ্যের ওপর নতুন করে আমদানি শুল্ক আরোপের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তাতে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী বিদেশে উৎপাদন ব্যবস্থা, সরকারি নীতি এবং বাণিজ্যিক আচরণ পর্যালোচনার জন্য এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে।
ইতঃপূর্বে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর য্ক্তুরাষ্ট্র বিদ্যমান শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে পাল্টা শুল্ক (রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) আরোপ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার। এ বাজারে পণ্য রফতানির জন্য বাংলাদেশ আগে থেকেই প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আসছিল। তার ওপর রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ হিসেবে আরো ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যা বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই পাল্টা শুল্কের আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে অবৈধ ঘোষিত হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের সব দেশের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে দেন। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এ সব শুল্ক আরোপের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।
তবে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে মোকাবেলা করতে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জ্বালানিমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সংলাপে যোগ দিতে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েই দং ২ এপ্রিল ঢাকা আসছেন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এটা হবে চীনের সাথে উচ্চ পর্যায়ের প্রথম সংলাপ। এর আগে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর ঢাকা সফর করে বাণিজ্য চুক্তির বিধানগুলো বাস্তবায়নের তাগাদা দিয়ে গেছেন।
এ দিকে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ উভয় সঙ্কটে রয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ অনৈতিক হলেও বাংলাদেশ তার সরাসরি নিন্দা জানাতে পারছে না। কেননা ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান বিরামহীনভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমানকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ বেসামরিক নাগরিক হতাহত এবং স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। এই জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতেই বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশের বসবাস।
গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু ইস্যুতে ক্রমাগত প্রোপাগান্ডা চালানোর কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবেলায় ভারতের কাছ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ চেয়েছে বাংলাদেশ, যা দেশটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের নেতা হাদি হত্যার মূল দুই আসামিকে ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করেছে, যাদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কনস্যুলার অ্যাকসেস চেয়েছে বাংলাদেশ।
চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা নেয়া থেকে বাংলাদেশকে দূরত্ব বজায় রাখার যুক্তরাষ্ট্রের তাগাদা সম্পর্কে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকা এসেই সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেছিলেন। আমার মতে, এটা অত্যন্ত অবিবেচক মন্তব্য। কোনো দেশ সংবেদনশীল ইস্যুতে বাংলাদেশকে যদি কিছু বলতে চায় বা আমাদের দিয়ে কিছু করিয়ে নিতে চায়, তবে তা প্রকাশ্যে বলার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থানে বাংলাদেশ সরকার বা জনগণ নিশ্চয়ই খুশি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র যা বলবে, বাংলাদেশ সরকার সেভাবেই চলবে, এটা প্রত্যাশা করা ঠিক না।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা উড়োজাহাজ বা সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারি। কিন্তু সেগুলোর দাম অনেক বেশি। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কমিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তি সই করেছিল। এখন নির্বাচিত সরকার এই চুক্তি পর্যালোচনা করতে পারে। চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত থাকলে তা পরিবর্তনের জন্য নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু তা অসম্ভব নয়। সম্পর্ক ভালো রাখতে হলে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।
প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণেই চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে থাকে উল্লেখ করে মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের প্রতি বাংলাদেশ নতজানু নীতি গ্রহণ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও ওই সময়ে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান ভারতের অনেক উপরে। এ বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে আমরা বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো করার জন্য চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং বাংলাদেশের স্বার্থেই চীনের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে এবং সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার সমমর্যাদার ভিত্তিতে সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতি ঘোষণা করেছে।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে মন্তব্য করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, এই অগ্রগতির চিত্র আমরা ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। ভারতকে আমাদের যেমন দরকার, বাংলাদেশকেও ভারতের তেমনি প্রয়োজন। তাই ভারতের সাথে সম্পর্ক একটা স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাওয়াটা খুব জরুরি। পাশাপাশি জাপান, রাশিয়া, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ অন্যদের সাথে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আমাদের সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে।


