বছরের আলোচিত হত্যা ‘ওসমান হাদি’

পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করা পুলিশ সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার পর ছাত্র-জনতার ক্ষোভ-বিক্ষোভে ধ্বংস্তুপে পরিনত হয় রাজধানীর ৫০ থানা। একপর্যায়ে ভয়ে কাতর হওয়া পুলিশ সদস্যরাও আত্মগোপনে চলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হলেও এখনো পুরোপুরি সক্ষমতা ফিরে পায়নি পুলিশ। তবে বিধ্বংসী থানাগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানো জন্য সেনাবাহিনী আপ্রাণ চেষ্টার পর অনেকটা নিজ পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • ৪ হাজার খুনের মামলা
  • বেড়েছে রাজনৈতিক হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই

চব্বিশে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করা পুলিশ সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার পর ছাত্র-জনতার ক্ষোভ-বিক্ষোভে ধ্বংস্তুপে পরিনত হয় রাজধানীর ৫০ থানা। একপর্যায়ে ভয়ে কাতর হওয়া পুলিশ সদস্যরাও আত্মগোপনে চলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হলেও এখনো পুরোপুরি সক্ষমতা ফিরে পায়নি পুলিশ। তবে বিধ্বংসী থানাগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানো জন্য সেনাবাহিনী আপ্রাণ চেষ্টার পর অনেকটা নিজ পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চলতি বছরে সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে গত ১২ ডিসেম্বর। ওইদিন জুমার নামাজের পর নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্যপ্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই দিনই খুনিরা দেশ ত্যাগ করে ভারতের আশ্রয়ে চলে যায়। এঘটনার পর ফুঁসে উঠে হাদির সমর্থকরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগসহ খুনিদের গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার ও ৪ দফা দাবি জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।

চলতি বছরে রাজধানীসহ সারাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, ধর্ষণের ঘটনা অহরহই প্রকাশ্যে ঘটেছে। এমনকি সহিংসতা তৈরী করে নৃশংস হত্যকান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি এবং পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায় ভীতি তৈরী হয়েছে। এছাড়াও টার্গেট কিলিং ছিল আলোচনার শীর্ষে। এর পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুরানো মাঠ দখলের খেলায় দিনে দুপুরে টার্গেট কিলিং সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে প্রার্থীদের মধ্যে খুনোখুনির ঘটনাও দেশ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচিত হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যঅনুযায়ী চলতি বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ণ ও ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের উপর হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান, আন্দোলনরত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর পুলিশের হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ ঘটেছে যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।

পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান মতে, গত জানুয়ারি থেকে শুরু করে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সারাদেশে ৩ হাজার ৫২৭ টি হত্যকান্ডের মামলা হয়েছে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় মেট্টোপলিটন শহরের মধ্যে ঢাকায় সবেচেয়ে বেশি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার পরই হত্যকান্ডের ঘটনায় চট্টগ্রাম মেট্টোপলিনের বেশি ঘটেছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ঢাকা বিভাগে হত্যার ঘটনা সবেচেয়ে বেশি। ঢাকার পরই হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে। পুলিশের অপরাধ পর্যালোচনা করে দেখে গেছে চলতি বছর গড়ে ১১ জনের বেশি খুন হয়েছে সারাদেশে। প্রতিমাসে সাড়ে ৩শ হত্যকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকান্ডের মধ্যে আলোচিত বেশকিছু ঘটনা ছিলো।

আলোচিত হত্যাকান্ড: গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর রাজধানীর কালভার্ট রোডে হত্যার টার্গেটে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা ৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারনা চালানো জুলাই যুদ্ধ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে মারা যায়। ওসমান হাদির কিলিং মিশয়ে অংশ নেওয়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম দাউদ ওরফে মাসুদ এবং সেচছাসেবকলীগ নেতা আলমগীর শেখকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় দেশ বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরী হয়েছে।

গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি কারখানার অনুষ্ঠানে ইসলাম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কথিত অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামক এক সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবককে নির্মমভাবে বেধম মারধর, গাছে ঝুলিয়ে এবং দগ্ধ করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ ও র‌্যাব বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে।

গত ৯ অক্টোবর খুলনার দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক নেতা মোল্লা মাহবুবুর রহমানকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওইদিন খুলনা মহানগরের দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় নিজ বাড়ির সামনে তাকে গুলি করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলে র‌্যাব ও পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। একই দিন রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে চোরাই তারের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এবং পূর্ব বিরোধের জেরে মো. সোহাগ চান নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

হত্যাকারীদের সঙ্গে পূর্ব বিরোধের জেরে এ নৃসংস হত্যকান্ডের ঘটনা ঘটে। হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন তৈরী হয়।

১০ নভেম্বর প্রায় ২৯ বছর আগের একটি হত্যা মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ হাজিরা দিতে যান তারিক সাইফ মামুন। ফেরার পথে বেলা ১১টার দিকে আদালতপাড়ার কাছে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অস্ত্রধারী দুই দুর্বৃত্ত প্রকাশ্যে গুলি করে তাকে হত্যা করে।

১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের পশ্চিম লতিফপুর এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৭ নভেম্বর পল্লবীতে একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে প্রবেশ করে মুখোশ ও হেলমেট পরা সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে। আগের মাসে চট্টগ্রামে চলন্ত প্রাইভেটকার থামিয়ে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে বিএনপি সমর্থিত এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকা-ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্রেফতার হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনঃ ২৭ মে ভোরে কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকায় তিন ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে সুব্রত বাইনের অন্য দুই সহযোগী শুটার আরাফাত ও শরীফকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড অ্যামোনিশন এবং একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।