যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করে ব্যাপক জানমালের ক্ষতিসাধন করে। এর কয়েক ঘণ্টা না যেতেই ইসরাইলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত, কাতার, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশের আমেরিকান ঘাঁটি ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে পাল্টা মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়। যা গতকাল রাত পর্যন্ত চলছিল। এসব ঘটনায় বিমান ভূপাতিত হওয়া ছাড়াও জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার সৌদি আরব। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ওমান, কাতার, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইনসহ শ্রমবান্ধব বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র। এসব দেশে দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশীরা কাজ করছেন। অনেকে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। আবার অনেকে অবৈধভাবে বসবাস করছেন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোতে প্রায় কোটি প্রবাসী অবস্থান করছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবেই আছে ৩০ লাখ বাংলাদেশী।
গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ইরানে হামলা শুরুর পর পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। ইরানের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের যে কয়টি দেশে আমেরিকান ঘাঁটি রয়েছে সেগুলোর উপর শুরু হয় বৃষ্টির মতো মিসাইল আর ড্রোন হামলা। এতে অনেক দেশেই হতাহতের ঘটনা ছাড়াও ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়। এতে এসব দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে দেখা দেয় অজানা শঙ্কা। কেউ কেউ নিরাপদ আস্তানায় থাকার পরও হামলা থেকে রক্ষা পাননি। আহত হয়ে কেউ কেউ আছেন হাসপাতালে। খবর পেয়ে প্রত্যেক দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে দেয়া হচ্ছে সাবধানে থাকা ও কাজ করার পরামর্শ। এদের মধ্য অনেক প্রবাসী কখন, কি হয়ে যায়, এমন শঙ্কায় তাদের সাথে থাকা টাকা ব্যাংকিং এবং হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যদিও দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় খরচের টাকা হাতে রেখে তারপর টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যার আগে কুয়েত সিটি থেকে মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে ইরানের মিসাইল এসে পড়ে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এতে চার বাংলাদেশী আহত হয়। এদের মধ্যে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আমিনুল ইসলামের অবস্থা শুনেছি খারাপ। আহতদের দেখতে গেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তিনি কুয়েতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিষয়ে শুধু বলেন, আমরা এখন আছি আতঙ্কের মধ্যে। না জানি কখন কি হয়? শুধু বিমানবন্দর না মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে শুধু মিসাইল মারছে ইরান থেকে। দূতাবাস থেকে আমাদের বাসায় থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করতে নিষেধ করেছে। বাজার সদাই বাড়তি কিনে রাখতে বলেছে। কিন্তু এখন তো সমস্যা ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাইরেন বাজছে। সাইরেন বাজার আওয়াজ শুনলে ঘর থেকে বের হয়ে আগে দেখি মিসাইল কোথায় পড়ছে। তার মতে যুদ্ধ শুরু হলে কুয়েতে না, এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কুয়েত সরকার রোববার ঘোষণা দিয়েছে, শতকরা ৩০ ভাগ লোক কাজ করবে। আর বাকি ৭০ ভাগ লোক বাসায় থাকবে। তবে আমার কোম্পানিতে আজ এই নির্দেশনা কতটুকু মেনেছে তা আমি এখন অফিস গেলে জানতে পারব। আমার কোম্পানিতে ৩০০ বাংলাদেশী কাজ করছে।
স্থানীয় রেমিট্যান্স হাউজের একজন নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি পরিবার নিয়ে আছি। সবাই আতঙ্কের মধ্যেই আছি। তবে ইরান যে হামলা করছে সেটি সাধারণ পাবলিকের উপর নয়, কুয়েতে আমেরিকার যেখানে যেখানে বিমান ঘাঁটি আছে, সৈন্য আছে সেগুলো লক্ষ্য করে। আমি অফিস করছি। লোকজনও আসছে টাকা পাঠাতে। অনেকে ভয়ে আছে কখন কি হয়, এই আতঙ্কে দেশের বাড়িতে কেউ কেউ টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে।
এই যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স পাঠানোর উপর কেমন প্রভাব পড়তে পারে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশে যত বৈধ চ্যানেলে টাকা যাচ্ছে তার একটি অংশ আমার হাউজ দিয়েও যাচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে এই সপ্তাহে অনেকে বেতন পেয়ে টাকা পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। আগামী সপ্তাহেও অনেকে টাকা পাঠাবে। এরপর থেকে সমস্যা শুরু হবে। ওই হিসাবে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে দেশে রেমিট্যান্সের ওপর ধাক্কা আসবে। এতে রিজার্ভে টান পড়বে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে তখন নিত্যপণ্যসহ সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়বে। এখানে কাজকাম কমে যাবে। বেতন হবে না। কর্মীদের হাতে টাকা থাকবে না। তখন পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে চলে যাবে।
উল্লেখ্য, গত ৩ দিন ধরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রবাসী বাংলাদেশীদের খোঁজ নেয়া এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার জন্য পররাষ্ট্র, প্রবাসী, বিমান ও পর্যটন, বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের সব কর্মকর্তা কর্মচারীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রবাসীবান্ধব কর্মীদের যাতে কোথাও খাবার, থাকাসহ কোনো সমস্যা না হয় সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিমুহূর্ত তাদের খোঁজ রাখছেন বলে দূতাবাসগুলো সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
এ দিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী যেসব ফ্লাইট যুদ্ধের কারণে ঢাকা ছাড়তে পারেনি ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব ভবনে রাখা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তার সচিব ও কর্মকর্তাদের নিয়ে বিমানবন্দরে অবস্থান করা যাত্রীদের খোঁজখবর নিতে যান এবং তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করেন। এ সময় মন্ত্রীর কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সরাসরি টেলিফোন করে বিদেশগামীদের খোঁজখবর নিতে দেখা যায়। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরও প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে বিদেশগামীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পান বলে কর্মীরা জানান।
তবে গতকাল সোমবার দু-তিনটি গন্তব্য ঢাকা থেকে বিমানের ফ্লাইট ছেড়ে গেছে বলে বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে।



