যুক্তরাষ্ট্র ইইউ চীন ভারত চায় নির্বাচনটা হয়ে যাক

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের অভিমত

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন বা ভারত- প্রত্যেকেই চাচ্ছে বাংলাদেশে একটা নির্বাচন হয়ে যাক। এরপর তারা নির্বাচিত সরকারের সাথে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেবে। কিন্তু নির্বাচন না হলে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে তাতে কোনো দেশই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে না। আর অনিশ্চিত পরিবেশে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবে না।

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন বা ভারত- প্রত্যেকেই চাচ্ছে বাংলাদেশে একটা নির্বাচন হয়ে যাক। এরপর তারা নির্বাচিত সরকারের সাথে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেবে। কিন্তু নির্বাচন না হলে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে তাতে কোনো দেশই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে না। আর অনিশ্চিত পরিবেশে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবে না।

গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সব দেশেরই কমবেশী উদ্বেগ রয়েছে। তারা এক ধরনের সমঝোতা চাচ্ছে, যাতে ঝামেলা ছাড়া নির্বাচনটা হয়ে যাক। কারণ দেশগুলো দেখেছে, যত দিন না নির্বাচন হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মবের হাতে চলে যাচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে দেশে একটা অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কোনো দেশই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারবে না। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, চীন, বা ভারত- প্রত্যেকেই চাচ্ছে একটা নির্বাচন হয়ে যাক। এরপর তারা নির্বাচিত সরকারের সাথে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়টিগুলোর আলোচনা এগিয়ে নেবে।

মাহফুজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে। দেশটি চাচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এমন একটি সরকার আসুক, যারা এই ইস্যুগুলো নিয়ে আর প্রশ্ন তুলবে না। অর্থাৎ তাদের স্বার্থরক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায়ের বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রতিশ্রুতি না পেলে পশ্চিমা দেশটি হয়ত হুমকির পথ বেছে নিত। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের যে সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু আসবে, তা নিয়ে দেশটি পরবর্তী সরকারের সাথে আলোচনা করবে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের মূল এজেন্ডা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া।

যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে নিজের স্বার্থ বাধাগ্রস্ত হতে দেবে না উল্লেখ করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য বোয়িং কেনা থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যে হলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল, তুলা আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে থেকে ওয়াশিংটন নিজেদের স্বার্থ যতটা সম্ভব আদায় করে নিচ্ছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে দেশটি এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে দেবে না। অন্যথায় কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইইউর অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো মন্তব্য করে মাহফুজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এক সময় ইউরোপের প্রধান মিত্র ছিল। এখন মিত্র দেশটিই তাদের বিভিন্ন ইস্যুতে অপমানজনক অবস্থায় ফেলছে। এক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকী বা পাল্টা শুল্কের কথা বলা যেতে পারে। এ সব কারণে বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা কমে যাচ্ছে। আর এটা মোকাবেলায় ইইউ বিভিন্ন দেশের সাথে আলাদাভাবে সম্পর্ক জোরদার করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইইউ এক দিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে মূল্যবোধের কথা বলছে, অন্য দিকে বাংলাদেশ সরকারের সাথে যতটা সম্ভব নমনীয় মনোভাব দেখাতে চাচ্ছে।

তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়কালে বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে চীন আধিপত্য বজায় রেখেছিল। দেশটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়েও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেন। বলে থাকেন, এই টানেলে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে, তাতে এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচই উঠে না, লাভ তো দূরের কথা। আসলে এই টানেল নির্মাণে দেশটি বিনিয়োগ করেছে কর্ণফুলী নদীর আপর পাড়ে চীনের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে মাথায় রেখে, যার কাজ এখনো চলছে। কিন্তু এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা চীন পছন্দ করে না।

বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে ভারত সবচেয়ে বেশি উৎসাহী উল্লেখ করে মাহফুজুর রহমান বলেন, ভারতের ধারণা বাংলাদেশে নতুন সরকার এলে সম্পর্কটা অনেক বেশি ভালো করতে পারবে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতবিদ্বেষী সরকার এলেও তাদের অসুবিধা নেই। কারণ ভারতবিদ্বেষী হিসেবে পরিচয় রয়েছে, এমন সরকারের সাথে সমঝোতা করা তাদের জন্য লাভজনক। এ ধরনের সরকারের কাছ থেকে ভারত যা- ই আদায় করতে পারুক না কেন, এটা নিয়ে বাংলাদেশের জনগনের প্রশ্ন তোলার সম্ভাবনা কম। ভারতপন্থী হিসেবে পরিচয় থাকায় প্রতিবেশী দেশটিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের যেকোনো পদক্ষেপ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ত।