দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে উৎপাদনকার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বছরের পর বছর ধরে লভ্যাংশ ঘোষণা নেই। এক দশকেরও বেশি সময় বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) হয়নি। তবুও শেয়ারবাজারের প্রধান বোর্ডে লেনদেন চলছে এমন কোম্পানির তালিকায় রয়েছে। কাগজে-কলমে অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে ব্যবসা নেই এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে কৃত্রিম দরবৃদ্ধি, কারসাজি ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের তির ঝুঁকি বাড়ছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের মতে, ডিলিস্টিং বিধান কার্যকর না হওয়ায় বাজার শৃঙ্খলা ও আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারে অন্তত ৩১টি অচল বা অকার্যকর কোম্পানির শেয়ার এখনো লেনদেন হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর ব্যবস্থাপনা কার্যত অদৃশ্য, এমনকি দৃশ্যমান সম্পদও নেই। এমন পরিস্থিতিতে অল্প মূলধনেই কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করা সহজ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি দুর্বল থাকলে স্বল্প সময়ের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রলুব্ধ হন, পরে দরপতনে মূলধন হারান।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ২০১৫ সালের তালিকাভুক্তি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কোম্পানিকে ডিলিস্ট করার মতা প্রধান বোর্ডের রয়েছে। তবে ডিলিস্টের আগে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সুরার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, বিধিমালায় পাঁচ বছর লভ্যাংশ ঘোষণা না করা, স্বেচ্ছায় বা আদালতের আদেশে লিকুইডেশনে যাওয়া, কিংবা টানা তিন বছর উৎপাদন-ব্যবসা স্থগিত রাখার মতো শর্ত পূরণ হলে ডিলিস্ট করা যায়।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতি ছাড়া বিধিমালা প্রয়োগ করা কঠিন। ২০১৯ সালে ১৪টি কোম্পানির পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে তৎকালীন কমিশনের কাছে ডিলিস্টিং সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে কোনো সাড়া না মেলায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। এ সময়ের মধ্যে অনেক অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর-পরিচালকেরা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে গেছেন। এতে তির দায়ভার পড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাঁধে।
ডিএসইর পরিচালক মো: সাজেদুল ইসলাম বলেন, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে ডিলিস্টিংয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্যামেলিটেক্স এর কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে স্পন্সর-পরিচালকদের হাতে ফ্রি-ফোটের মাত্র ৪.০২ শতাংশ রয়েছে। এখন ডিলিস্ট করলে তির ভার পড়বে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর। অতীতে ডিলিস্ট করা কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তেেপ আবার তালিকাভুক্ত করার নজিরও আছে।
যেমন রহিম ফুড করপোরেশন ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ডিলিস্ট হলেও দুই বছর পর আবার প্রধান বোর্ডে ফিরে আসে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ও লভ্যাংশহীন কোম্পানিকে প্রধান বোর্ডে রেখে দিলে বাজারের মান ও আস্থা তিগ্রস্ত হয়। নতুন সরকার গঠনের পর বাজার শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে ডিলিস্টিং বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনমঞ্চ থেকে সরাতে বাস্তবসম্মত আইনি কাঠামো ও নির্দিষ্ট সময়সীমা জরুরি।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশ্বব্যাপী ডিলিস্টিং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমাদের দেশেও আইন আছে, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যমান বিধানকে আরো সুসংহত করে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, ডিলিস্টিংয়ের আগে ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এক্সিট অপশন, যেমন বাধ্যতামূলক বাইব্যাক, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ বা বিশেষ সেকেন্ডারি প্ল্যাটফর্ম, নির্ধারণ করা যেতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের কমিটি গত নভেম্বরে সুপারিশ করে, দীর্ঘদিন বন্ধ, লোকসানগ্রস্ত ও লভ্যাংশহীন কোম্পানির জন্য আলাদা ‘আর’ ক্যাটাগরি তৈরি করা হোক, যেখানে এসব শেয়ার পৃথক প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হবে। এতে দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তথ্যে দেখা যায় বর্তমানে ৩৫৯টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১১টিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেয়া হয়েছে কারখানা বন্ধ, পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে বেশি সঞ্চিত লোকসান, সময়মতো এজিএম না করা, ঘোষিত লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে। ‘জাঙ্ক’ শেয়ারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। বাজার উন্নয়নের পথে এটি বড় বাধা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির উদাহরণও কম নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলস দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের পরিচালন লোকসানে এবং দশকের পর দশক লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। তবুও গত এক মাসে এর শেয়ারদর ২৭ শতাংশ বেড়ে ১৭২ টাকায় উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন দরবৃদ্ধি মৌলভিত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং সরবরাহ-চাহিদার কৃত্রিম খেলায় দাম বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিলিস্টিংয়ে বিলম্বের ফলে তিন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রথমত, কৃত্রিম র্যালি ও ‘পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প’ কৌশল সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, সুশাসনহীন কোম্পানির উপস্থিতি বাজারের সামগ্রিক মান কমায়। তৃতীয়ত, নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট করে। বিশেষ করে বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা তালিকাভুক্ত কোম্পানির গুণগত মান ও শাসনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেন; জাঙ্ক শেয়ারের আধিক্য তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নের স্বার্থে এসব সমস্যা সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদেেপর কথা বলছেন। তারা বলছেন, নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ডিলিস্টিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা; ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ন্যায্য এক্সিট মেকানিজম চালু করা; দীর্ঘদিন বন্ধ কোম্পানির শেয়ার আলাদা প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর; স্পন্সর-পরিচালকদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো এবং শেয়ার বিক্রিতে কঠোর নজরদারি; কারসাজির প্রমাণ মিললে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে টেকসই উন্নয়ন চাইলে তালিকাভুক্তির মান যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে সাহসী সিদ্ধান্তে সরাতেও হবে। মাঠে যার অস্তিত্ব নেই, তাকে বোর্ডে বাঁচিয়ে রাখলে তি শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরই। কার্যকর ডিলিস্টিং এখন সময়ের দাবি, বাজার শৃঙ্খলা ও আস্থা ফেরাতে এটি আর বিলম্ব না করাই পুঁজিবাজারের জন্য কল্যাণকর বলে তারা মনে করেন।



