বাংলাদেশের আইটি খাতের অন্যতম শীর্ষ উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মাহমুদ হোসাইন বলেছেন, যুদ্ধের সময় জ্বালানি সঙ্কটে অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থায় সংস্কার সাধন বিশেষভাবে জরুরি। আমাদের একটি প্রযুক্তিনির্ভর, প্রো-অ্যাকটিভ সিস্টেমে যেতে হবে। পুরো জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল- রিফাইনারি বা আমদানি টার্মিনাল থেকে শুরু করে ডিপো, ট্যাংকার, ফিলিংস্টেশন এবং ভোক্তা- সবকিছুকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।
গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মিলেনিয়াম ইনফরমেশন সল্যুশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী প্রকৌশলী মাহমুদ হোসাইন এ কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত দেয়া হলো-
প্রশ্ন : মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কতটা উদ্বেগজনক?
মাহমুদ হোসাইন : অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি সরবরাহের বড় অংশই সঙ্ঘাতপ্রবণ রুট দিয়ে আসে। এই রুটগুলোতে সামান্য বিঘœ ঘটলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে- দাম বেড়ে যায়, সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয় এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়।
প্রশ্ন : তাহলে কি এই সঙ্কট পুরোপুরি বৈশ্বিক, নাকি দেশের ভেতরেও সমস্যা আছে?
মাহমুদ হোসাইন : বৈশ্বিক সঙ্কট অবশ্যই একটি বড় কারণ, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কিন্তু আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষ হবে, তা সম্পূর্ণ আমাদের হাতে। বর্তমান সঙ্কট আসলে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো ঠিক করার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন : অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়?
মাহমুদ হোসাইন : সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সিস্টেমগত অদক্ষতা। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানির প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অপচয় হয়- পাচার, ভেজাল ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। বৈশ্বিক সঙ্কটের সময় এই ধরনের অপচয় পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তোলে।
প্রশ্ন : বর্তমান সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কী?
মাহমুদ হোসাইন : এখনো অনেক ক্ষেত্রে কাগজভিত্তিক রেকর্ড, ম্যানুয়াল পরিদর্শন এবং বিলম্বিত রিপোর্টিংয়ের ওপর নির্ভর করা হয়। ফলে কোনো অনিয়ম ধরা পড়তে পড়তেই অনেক দেরি হয়ে যায়। এই প্রতিক্রিয়াশীল পদ্ধতি সঙ্কট মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন : এর সমাধান কিভাবে সম্ভব?
মাহমুদ হোসাইন : আমাদের একটি প্রযুক্তিনির্ভর, প্রো-অ্যাকটিভ সিস্টেমে যেতে হবে। পুরো জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল, রিফাইনারি বা আমদানি টার্মিনাল থেকে শুরু করে ডিপো, ট্যাংকার, ফিলিংস্টেশন এবং ভোক্তা, সবকিছুকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।
প্রশ্ন : এই ডিজিটাল ব্যবস্থাটি কিভাবে কাজ করবে?
মাহমুদ হোসাইন : প্রতিটি জ্বালানি ব্যাচকে একটি ডিজিটাল আইডেন্টিটি দেয়া হবে। এটি রিফাইনারি থেকে শুরু করে ডিপো, পরিবহন এবং ফিলিংস্টেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যাচাই করা হবে। পরিবহনের সময় জিপিএস ট্র্যাকিং থাকবে এবং ভোক্তারা মোবাইল স্ক্যানের মাধ্যমে জ্বালানির সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। এতে প্রতিটি লিটার জ্বালানির গতিপথ নজরদারিতে থাকবে।
প্রশ্ন : এতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে?
মাহমুদ হোসাইন : সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি। জ্বালানি কোথায় যাচ্ছে, কোথায় ব্যবহার হচ্ছে- সবকিছু রিয়েল-টাইমে দেখা যাবে। এতে পাচার, ভেজাল বা তথ্য গোপনের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
প্রশ্ন : প্রযুক্তি কিভাবে নজরদারি আরো শক্তিশালী করতে পারে?
মাহমুদ হোসাইন : ইন্টেলিজেন্ট মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেনের ডাটা বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা সম্ভব। যেমন- হঠাৎ করে কোনো জায়গায় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার বা নির্ধারিত রুট থেকে ট্যাংকার সরে যাওয়া। তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
প্রশ্ন : ভোক্তাদের এতে কী ভূমিকা থাকবে?
মাহমুদ হোসাইন : ভোক্তাদেরও এই ব্যবস্থার অংশ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তারা জ্বালানির মান যাচাই করতে পারবে, কাছাকাছি স্টেশনে স্টক আছে কি না জানতে পারবে এবং ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়ম কমবে।
প্রশ্ন : ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় এই প্রযুক্তির কী প্রভাব পড়বে?
মাহমুদ হোসাইন : এটি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাকে অনেক বেশি কার্যকর করবে। সঙ্কটের সময় সরকার কৃষি, গণপরিবহন বা জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে পারবে এবং অপব্যবহার রোধ করা সহজ হবে।
প্রশ্ন : এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি সুফল কী?
মাহমুদ হোসাইন : অপচয় কমলে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে, নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে এবং জনগণের আস্থা বাড়বে। একই সাথে একটি দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ কি এই ধরনের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত?
মাহমুদ হোসাইন : অবশ্যই। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আর্থিক সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় পরিসরে ডিজিটাল সমাধান বাস্তবায়ন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জ্বালানি খাতেও দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
প্রশ্ন : এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের মূল বার্তা কী?
মাহমুদ হোসাইন : বৈশ্বিক সঙ্কট চলতেই থাকবে। কিন্তু শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গড়ে তুললে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য শুধু জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রতিটি লিটার জ্বালানির দক্ষ, স্বচ্ছ ও ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা। একটি স্মার্ট, ডিজিটাল জ্বালানি ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।



