বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। তবে এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে একটি বড় ঝুঁকি- অতিরিক্ত বাজারনির্ভরতা। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র- এই দুই বাজারেই রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের মোট তৈরী পোশাক রফতানির প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ। নির্দিষ্ট কয়েকটি গন্তব্যে এত বেশি নির্ভরশীলতা একদিকে যেমন স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করে, অন্য দিকে বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নীতিগত পরিবর্তনের সময় পুরো খাতকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এই বাস্তবতায় নতুন ও অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশের উদ্যোগকে পোশাক খাতের জন্য সময়োপযোগী ও কৌশলগত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, নতুন বাজার অনুসন্ধানে কিছু অগ্রগতি থাকলেও কাক্সিক্ষত সাফল্য এখনো অধরা।
নতুন বাজারে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পাঁচ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিলিয়ে নতুন বাজারে রফতানির পরিমাণ ছিল আনুমানিক তিন দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রফতানির মাত্র ১৪ শতাংশের কিছু বেশি।
খাত সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ছিল এই অংশকে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। বরং পরিসংখ্যান বলছে, নতুন বা অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এসব বাজারে রফতানি কমেছে প্রায় তিন থেকে পাঁচ শতাংশ। বিশেষ করে রাশিয়া ও তুরস্কে রফতানি কমেছে প্রায় আট শতাংশ, আর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কমেছে ছয় শতাংশেরও বেশি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সঙ্কট এবং ভোক্তা ব্যয়ের চাপ এসব বাজারে চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজার : সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজারগুলোর মধ্যে জাপানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে জাপানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বছরে প্রায় এক দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। গত এক দশকে এই বাজারে রফতানি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তবু জাপানের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ এখনো চার শতাংশের নিচে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বড় হলেও সেখানে মান নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত সেলাই, উচ্চমানের ফিনিশিং এবং সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব মানদণ্ড পূরণ করা এখনো দেশের সব কারখানার পক্ষে সহজ নয়।
ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল আনুমানিক ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রফতানির মাত্র ৩ শতাংশের মতো। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, সীমান্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় ভারতের নীতিগত অবস্থান এই বাজারে রফতানি বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চীনের বাজারে প্রবেশ আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদক দেশ হওয়ায় সেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র। ২০২৪ সালে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে চীনের মোট পোশাক আমদানি বাজারের আকার ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশ এক শতাংশেরও কম। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পণ্য ছাড়া চীনের বাজারে টিকে থাকা কঠিন।
বিপণন দুর্বলতা ও কাঠামোগত বাধা : নতুন বাজারে পিছিয়ে পড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে বিপণন দুর্বলতা এবং বাজার গবেষণার অভাব। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাক কারখানা এখনো ক্রেতা-নির্ভর অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি কিংবা সরাসরি বিদেশী খুচরা বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে নতুন বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের দৃশ্যমানতা তৈরি হতে সময় লাগছে।
এ ছাড়া নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৪ শতাংশে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে যেখানে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, সেখানে নতুন বাজারে বাংলাদেশকে দামে কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে।
ইতিবাচক দিক ও সম্ভাবনার জায়গা : সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পোশাক খাতে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে। ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৩০টির বেশি স্বীকৃত গ্রিন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে, যা বিশ্বের মোট গ্রিন কারখানার প্রায় ৫৫ শতাংশ।
এই অর্জনকে নতুন বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ইউরোপের বাইরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে টেকসই উৎপাদন এখন বড় আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো বলছে, বাজার বহুমুখীকরণে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে নতুন বাজারে প্রবেশ আরো কঠিন হয়ে উঠবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতামত : বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছি। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা এখন আমাদের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠছে। নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য পণ্যের মান, ডিজাইন ও ডেলিভারি সক্ষমতায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা অনেক কারখানার জন্য এখনো চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরো বলেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে দাম নয়, মান ও নির্ভরযোগ্যতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘নতুন বাজারে যেতে হলে আমাদের কম দামের বাল্ক অর্ডার থেকে সরে এসে ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্যে যেতে হবে,’ বলেন তিনি। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, নতুন বাজারে রফতানি কমার পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটও দায়ী। তার মতে, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে নতুন বাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দুইটি বাজারে প্রায় ৭০ শতাংশ রফতানি নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি। তার মতে, বাজার বহুমুখীকরণে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বাণিজ্য কূটনীতি, শুল্ক সুবিধা এবং লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্ক সুবিধা হারালে বছরে অতিরিক্ত দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার শুল্ক ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ব্র্যান্ডিং ও সরাসরি বাজারে যাওয়ার দুর্বলতা নতুন বাজারে প্রবেশের বড় সীমাবদ্ধতা। তার মতে, সরকার ও শিল্প খাত যৌথভাবে ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠন করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যেতে পারে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বাংলাদেশের বড় শক্তি হলেও তা এখনো পুরোপুরি মূল্যসংযোজনে রূপান্তর করা যাচ্ছে না। ‘নতুন বাজারে ক্রেতারা টেকসই উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত দাম দিতে রাজি, কিন্তু সেই আলোচনায় আমরা অনেক সময় পিছিয়ে থাকছি,’ বলেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন বাজারের সন্ধান এখন কেবল কৌশলগত লক্ষ্য নয়, বরং সময়ের দাবি। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, উদ্যোগ থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত। কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া নতুন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা কঠিন হবে। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে না পারলে বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে দেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।



