রাজশাহী-কুষ্টিয়ায় হামে আরো ৪ শিশুর মৃত্যু

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দেশে হামে শিশুদের আক্রান্ত্রের লাগাম টানা যাচ্ছে না, এ অবস্থায় আজ থেকে সারা দেশে শুরু হচ্ছে হাম ও রুবেলার বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন। এ দিকে শুক্রবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী ও কুষ্টিয়ায় হামে আক্রান্ত হয়ে দুইজন করে মোট চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ইব্রাহিম নামে আট মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে আইজা নামে সাড়ে পাঁচ মাসের আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হলো। ইব্রাহিম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চঞ্চল হোসেনের ছেলে। সে শুক্রবার বিকেলে হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। এ ছাড়া আইজা কুষ্টিয়া শহরের রেনউইক এলাকার মমিনুর রহমানের মেয়ে। সে গত চার দিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিল।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টায় এ হাসপাতালে ভর্তি হয় ইব্রাহিম। সে হাম ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা: এ এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গত গত ৩০ মার্চ সোমবার আইজা নামে শিশুটি হাম ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর আগে, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় হামে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফরান নামে আট মাস বয়সী এক শিশু মারা যায়।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ২০ রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলায় ৩২০ জনের হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ২৩০ জন ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ-ছয়জন শিশুর অবস্থা রয়েছে আশঙ্কাজনক। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে কুষ্টিয়ায় হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ-এ।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার দুপুর থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। গতকাল হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা: শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে তিন শিশু। বর্তমানে রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৭৭ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৩৮ জন।

এ দিকে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় চিকিৎসাব্যবস্থাসহ সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নিতে গতকাল সকালে রামেক হাসপাতাল পরিদর্শনে যান সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো: মাহফুজুর রহমান রিটন। এ সময় তিনি হাসপাতালের আইসিইউ, শিশু ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন এবং হাম রোগের চিকিৎসাসহ অন্যান্য চিকিৎসাসেবার সার্বিক খোঁজখবর নেন। পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন তিনি।

রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি সুদৃষ্টি রয়েছে। আমরা আশা করি, রামেক হাসপাতাল এবং শিশু হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম, রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম, রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রেজাউল করিম, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: এফ এ এম আঞ্জুমান আরা বেগম, রামেক হাসপাতালের চিকিৎসরা ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ২৪ শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এতে করে বর্তমানে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭ জনে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২০৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩২ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এ সময়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ২৩ শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মমেক হাসপাতালের হাম চিকিৎসকদলের ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহা: গোলাম মাওলা জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিনের নমুনা প্রতিদিনই পাঠানো হয় এবং সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। বর্তমানে তিন মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা ভর্তি থাকলেও ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সীদের সংখ্যাই বেশি।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিচ্ছিন্নভাবে রোগী আসা শুরু হলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎ করেই রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনটি মেডিক্যাল টিম গঠন করে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

টিকার চাহিদা ও সরবরাহ : ময়মনসিংহে এম আর (হামের) টিকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হলেও পুরোপুরি দেয়া সম্ভব হয়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২১ হাজার ভায়ালের চাহিদা থাকলেও মাত্র ১৯ হাজার ভায়াল সরবরাহ হয়েছে। ফলে প্রায় ১৫ হাজার শিশুর টিকা বাকি রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীরা টিকা সঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে চাপের মধ্যে কাজ করছেন।

জনবল ও কর্মবিরতির প্রভাব : জেলায় ৭১১ জন স্বাস্থ্য সহকারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ৪৮০ জন কর্মরত আছেন। বাকি ২৩১ পদ শূন্য। গত বছর বিভিন্ন দাবিতে তিন দফায় কর্মবিরতি থাকায় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুরা সময়মতো টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অসচেতন অভিভাবক ও সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা : প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক অভিভাবক এখনো শিশুকে টিকা দিতে চায় না। এ ছাড়া টিকার সঠিক সংরক্ষণ, ডোজ মাপ ও মেয়াদ সীমিত হওয়ার কারণে কিছু টিকা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলেন, টিকা ঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

রংপুর ব্যুরো জানায়, রংপুর বিভাগে ক্রমেই বাড়ছে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে আরো ১২ জন। এ নিয়ে বিভাগে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৮৬। তবে এখনো কেউ মারা যায়নি। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা: গওসুল আজম চৌধুরী জানান, শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে শনিবার (৪ এপ্রিল) সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগে আরো ১২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে গত ৩০ মার্চ থেকে এই বিভাগে হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল ৮৬-তে। তাদের মধ্যে ৫৬ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। বাকি ৩০ জন রংপুর দিনাজপুর-মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে।

ডা. গওসুল আজম চৌধুরী আরো জানান, ‘ভর্তি হওয়া রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষায় আরো একজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল সাতজনে। হাম শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় একজন করে এবং নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁওয়ের দুইজন রয়েছে।’

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হাম চিকিৎসা কার্যক্রম বিশেষ কমিটির ফোকাল পারসন ডা: আ ন ম তানভীর চৌধুরী জানান, এই হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে শনিসবার সকাল ১০টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজন রোগী ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২১ জনে। এর মধ্যে সাতজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছে। কেউ মারা যায়নি।

মাদারগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় হামে আক্রান্ত পাঁচ শিশু শনাক্ত হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: আব্দুল্লাহ আল মামুন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষেণে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রোগটির বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, উপজেলায় হামের টিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রয়েছে। তাই এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অভিভাবকদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা দেয়ার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি, তাদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে এসে টিকা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।