নিজস্ব প্রতিবেদক
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা এই বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ : আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে যে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণে ৮ আগস্ট ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী জনগণের ইচ্ছা এই সরকারের বৈধতার স্বীকৃত উৎস। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়ে এর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, তাই এই গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির তার প্রবন্ধে বৈশ্বিক নজির টেনে বলেন, ফ্রান্স, ইরান, ফিলিপাইন বা মিসরের মতো দেশগুলোতেও বিপ্লব পরবর্তী সরকার গঠিত হয়েছে এবং আদালত জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকেই চূড়ান্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশেও সুপ্রিম কোর্ট তার বিভিন্ন রায়ে, বিশেষ করে সিভিল পিটিশন ৭৮১/২০২৫-এ এই সরকারের বৈধতা ও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ২০০১ ও ২০০৯-২০২৪ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংসদে কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সংস্কারের পথে অন্তরায় হতে পারে। প্রবন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনের আগের ও পরের অবস্থানের পরিবর্তনের সমালোচনা করে বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের পূর্ববর্তী ‘সার্বভৌম জনরায়’ সংক্রান্ত বক্তব্যের বিপরীতে বর্তমান ধীরগতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দোহাইকে সংস্কারের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সংলাপে উপস্থিত অন্যান্য আলোচকরা বলেন, জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির স্বার্থে নয় বরং এটি দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। তাদের মতে, প্রচলিত পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের চেয়ে ‘সংবিধান সংস্কার’ প্রক্রিয়াই হবে সবচেয়ে সহজ ও টেকসই সমাধান। বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, অতীতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চার ফলে যেভাবে শাসনব্যবস্থার পতন হয়েছে, সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। গোলটেবিল সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষারই পরিপূরক। এই ঐতিহাসিক সুযোগকে কোনো অজুহাতে হাতছাড়া করা সমীচীন হবে না। বক্তারা অবিলম্বে গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে কী-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংবিধান ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। অতিথি আলোচক হিসেবে সংলাপে অংশ নেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী, গণ-অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফারুক হাসান এবং এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার।
আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব ও রাজনীতিবিদ এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকীব আলী, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. এ কে এম কবিরুল ইসলাম, সাবেক সচিব আবদুল হালিম, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর, প্রফেসর লে. কর্নেল (অব:) আকরাম আলী, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসাইন। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মতামত প্রকাশ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, মেজর (অব:) মোজাম্মেল হোসাইন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মে. জে. (অব:) আমসাআ আমিন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ কর্নেল (অব:) আশরাফ আল দীন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর (অব:) আফসারী আমিন, মেজর (অব:) মেসবাহুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাসমিন রানা। সংলাপে সভাপতির বক্তব্য রাখেন নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট ব্রি. জে. (অব:) মোহাম্মদ হাসান নাসির। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের লিড মেম্বার ক্যাপ্টেন (অব:) জাহাঙ্গীর, রাব্বুল ইসলাম খান এবং মেজর (অব:) আবদুল্লাহ আল ফারুকী।



