চব্বিশের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সম্প্রতি এই স্থবির সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে দুই দেশের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে আবারো ভিসা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য ভারতীয় ভিসা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগরতলা ও শিলিগুড়ির হোটেলগুলোতে বাংলাদেশীদের থাকার ওপর ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। আবারো চালু হচ্ছে কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস।
গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জরুরি চিকিৎসার জন্য সীমিত পর্যায়ে ভিসা দেয়া হচ্ছিল। ভারতীয় হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চিকিৎসা ভিসার সাক্ষাৎকারের স্লট বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগের চেয়ে সহজে এ ধরনের ভিসার জন্য সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া ঈদকে সামনে রেখে অনেক বাংলাদেশীই বিশেষ করে কলকাতায় বাজার করতে যেতেন। সেই দিকটা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকদের জন্য সীমিত আকারে ভিসা চালুর চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক পর্যায়ে উন্নীত করা হতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত কাজ করতে আগ্রহী। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে রুটিন কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তায় বলেছেন, আমাদের বহুমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কনেক্টিভিটি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে আপনার সাথে আমি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। অর্থনৈতিকভাবে দু’টি দ্রুত গতিশীল দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের টেকসই প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক অগ্রগতিতে একসাথে কাজ করতে পারে।
বিএনপির মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি উপস্থিত ছিলেন। ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদির চিঠি হস্তান্তর করেছেন।
এ ব্যাপারে গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক হিসাবে দেখা যেতে পারে। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ভারতের সাথে সম্পর্কে একটি টানাপড়েন চলছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছিল। এখন এগুলো পুষিয়ে নেয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। চলতি বছর গঙ্গার পদ্মা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন করার জন্য ভারতের সাথে সমঝোতা করতে হবে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও পুশইন ঠেকানোর মতো বিষয়গুলো রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে গতি ফেরানো দরকার। তাই এসব বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।
নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেরও উদ্বেগ রয়েছে মন্তব্য করে হুমায়ুন কবির বলেন, এই ইস্যুগুলো মোকাবেলার জন্য একটি অভিন্ন ক্ষেত্র বের করার চেষ্টা করতে হবে। তবে এই প্রচেষ্টা পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে হতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়ের মতো চাপিয়ে দেয়ার মতো বিষয়ে যাতে এটা পরিণত না হয়। কেননা এটা দুই পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্ভাব্য তৎপরতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সীমান্তে অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান, চরমপন্থীদের যাতায়াতসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই এসব মোকাবেলায় দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ যাতে সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্যও সতর্ক থাকা উচিত।



