মুফতি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, আমাদের জীবনচক্রটা এখনো রমজানকেন্দ্রিক করতে না পারায় এক মাস সিয়াম সাধনার পর রোজার আবহটা আমরা ধরে রাখতে পারি না। নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সাহাবিদের জীবন লক্ষ করলে দেখবেন তারা এমনভাবে রমজানে ইবাদতের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিতেন যে রোজা চলে গেলেও ছয় মাস অন্তত তাদের কাছে আমেজটা থাকত আর বাকি ছয় মাস তারা ফের অপেক্ষায় থাকতেন আগামী রমজান মাসের জন্য। মুফতি সাইফুল বলেন, রমজানে নানাবিধ ইবাদত করলেও তার প্রায়োগিক ব্যবহার জীবনের সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে উঠছে না। যাপিত জীবনের নানা ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ, লেনদেন, জীবনদর্শনে নেগেটিভ বিষয়গুলো সঠিকভাবে অপসারণ করতে পারছি না। শাওয়ালের চাঁদ দেখার সাথে সাথে ফের আমরা আমাদের জীবন আগের মতো পাল্টে ফেলি।
নয়া দিগন্ত : ফি বছর রমজান আসে রমজান যায়, আমরা পুরোপুরি বিশুদ্ধ হয়ে উঠতে পারি না কেন?
মুফতি সাইফুল : প্রথমত রমজান আমাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত নিয়ে আসে। এটা পুরো মাসজুড়েই নিয়ে আসে। এটা যে শুধু ১০ দিন ১০ দিন করে নিয়ে আসে তা নয়। রমজান শুধু ফজিলতের জন্য আসেনি, আমাদেরকে প্রশিক্ষিত করতেও আসছে। যখন কেউ ভালো বা বড় কোনো মহৎ পথে চলেন তখন তাকে সেই পথ ধরে রাখার জন্য তাকে নানাভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়। পৃথিবীব্যাপী এটা একটা বিস্তৃত নিয়ম। আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদেরকে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই শ্রেষ্ঠত্ব কিভাবে আমরা ধরে রাখব, এটার প্র্যাকটিসটা কোথায় হবে, কিভাবে হবে, আল্লাহ তায়ালা নানাভাবে বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম একট প্রশিক্ষণ হচ্ছে রমজান মাসে রোজা রাখা অবস্থায় দিনে ও রাতে নানাবিধ ইবাদতের মাধ্যমে আমরা নানা ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকি। একজন মানুষের জীবনজীবিকা, যাপিত জীবনের নানা ক্ষেত্রে তার নেগেটিভ, পজিটিভ অনেক দিক থাকে। কিন্তু নেগেটিভ দিকগুলো সে তার জীবন থেকে কিভাবে অপসারণ করবে, কিভাবে বিষয়গুলো থেকে বের হয়ে আসবে এটা চট করে সে চাইলেই হবে না। এটার জন্য শুধু নিয়তই যথেষ্ট নয়, প্রশিক্ষণ দরকার। জীবনে সে যেন অনুশীলনটা করতে পারে, এর জন্য রমজানের রোজার পাশাপাশি অনেক নিয়ম আছে যা আমাদের চর্চা করতে বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিষয়টা অর্জন করতে পারি।
নয়া দিগন্ত : এ ধরনের প্রশিক্ষণ কি নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা হওয়া উচিত নয়? তাকওয়া বা খোদাভীতি যাতে আমরা আমাদের প্রায়োগিক জীবনে প্রয়োগ করতে পারি?
মুফতি সাইফুল : হ্যাঁ, প্রশিক্ষণের মানে হচ্ছে সময়মতো প্রশিক্ষণ নিয়ে যখন আমি মূল জায়গায়, মূল ময়দানে আসব অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা অনুসরণ করব। প্রশিক্ষণটাকে কাজে লাগাবো। কেবল রমজানের এক মাসে বিশেষ কিছু ইবাদত করলাম তারপর তা ভুলে গেলাম এবং আগামী রমজান পর্যন্ত এভাবেই আমার জীবন চলল, রমজান আসলে আবার আমি ভালো মানুষ হয়ে গেলাম এমনটা ঠিক নয়। রমজান আমাকে বলছে যে তুমি বাকি এগারো মাস যা-ই ছিলে, রমজান যেহেতু তুমি পেয়েছো তো নিজেকে গড়ে তোল। এরপর যেভাবে তুমি শিখেছো, জেনেছো, বুঝেছো এবং প্র্যাকটিস করেছে এটার ওপর তুমি অবিচল থাক। সাহাবাদের জীবন বা সেই সোনালি যুগের ইতিহাস দেখলে দেখি রমজান চলে গেলেও রমজানের পুরো আবহ তাদের সাথে থাকত ছয় মাস। আর বাকি ছয় মাস তারা ফের রমজানের অপেক্ষা করতেন। এভাবে তাদের লাইফ সার্কেলটা রমজানকেন্দ্রিক ছিল। আর আমরা রমজান চলে গেলে আমাদের জীবনটাও পাল্টে ফেলি। এর জন্য আসলে রমজান আসেনি।
নয়া দিগন্ত : রোজা কবুল হয়েছে কি না এটা বুঝব কিভাবে?
মুফতি সাইফুল : এটা বুঝার একটা প্যারামিটার আছে। রমজানের সময় যা করেছেন তা যদি রমজানের পরও তা আপনার জীবনে রয়ে যায়, সেই প্র্যাকটিসের ওপর আপনার জীবনটা চলমান থাকে, তাহলে বুঝবেন রোজা আপনার জীবনে কাজে এসেছে। সিয়াম আপনাকে সুন্দর একটা পথ দেখিয়েছে। কিন্তু যদি দেখেন আপনার জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি, আগে যেমন ছিলেন তেমনি আছেন, রমজানে শুধু কিছুটা সামলে চলেছেন, তাহলে রোজার সুফল আপনি পাননি। এ রমজান আপনি আপনার জীবনে কাজে লাগাতে পারেননি।
নয়া দিগন্ত : তার মানে সামাজিকভাবে রমজানের প্রতিফলন শুধু কামনা করলেই আসে না অনুসরণ করতে হয়, ঘুষ দুর্নীতি থাকবে না, ধর্ষণ হবে না, শোষণ থাকবে না, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাওয়া ইত্যাদি, কিন্তু কার্যকরভাবে তা গড়ে তোলা যাচ্ছে না কেন?
মুফতি সাইফুল : মূল সমস্যা হচ্ছে, আমরা রোজার বাহ্যিক দিকটা দেখি, অন্তর্গত বিষয়গুলো লক্ষ করি না। প্রত্যেকটা ইবাদতের একটা অন্তর্গত শিক্ষা আছে। আমরা সালাত আদায়ের সময় রুকু দিলে, সিজদা দিলে আল্লাহ তায়ালার লাভ কী? ক্ষতি কী? কুরআনে তিনি বলছেন, পৃথিবীর কেউ যদি বা তার সৃষ্টিজগতের কেউ যদি ইবাদত না করে তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে না। তার মানে আমরা সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত যা বলি এসবের মধ্যে প্রবেশ করলে দেখা যায় অফুরন্ত শিক্ষা অপেক্ষা করছে। এই শিক্ষা যেন আমরা নিতে পারি সেটাই ইবাদতগুলোর লক্ষ্য। কুরআন বলছে, রমজান আমাদের তাকওয়া বা খোদাভীতি শিক্ষা দেয়। জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন যিনি আপনাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন আপনার পদক্ষেপে তার সায় আছে কি না, নাকি তার অনুমোদনের বাইরে কিছু করছি। আল্লাহর নির্দেশনা, নবীজি সা:-এর শিক্ষায় নিঃসন্দেহে কল্যাণ আছে, সেটাই মানবতা, সেটাই মানবাধিকার, সেটাই হলো মনুষ্যত্ব।
নয়া দিগন্ত : ধর্মীয়ভাবে আপনারা আলেমরা সেই শিক্ষাটা দিয়ে থাকেন, সামাজিকভাবে কিছুটা চর্চা হয়, রাষ্ট্রের এক্ষেত্রে ভূমিকা কেমন থাকা উচিত?
মুফতি সাইফুল : নিশ্চয়ই। জনগণ মিলেই তো রাষ্ট্র। তাকওয়া বা খোদাভীতি মানে আপনি যা কিছু করছেন তা আল্লাহ দেখছেন এই বিশ্বাসটা নাগরিকদের মধ্যে তৈরি করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাঠামো বা যারা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আছেন, তাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বা রাষ্ট্র যাকে নানা জায়গায় বসিয়ে রেখেছে তাদের ইসলাম বলেছে দু’টি কাজ করতে। এক, তুমি তোমার কাজে দক্ষ হবে, আরেকটা হলো তুমি তোমার কাজে সৎ হবে। আমাকে খোদা দেখছেন এই অনুভূতি আমাদের অসততা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। রমজানের প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কোনো মানুষ রাষ্ট্রের এমন একটা দায়িত্বপূর্ণ স্থানে বসে আছেন, চাইলে সেখান থেকে সেবা দিতে পারেন আবার দুর্নীতি করতে পারেন। রমজানের শিক্ষা তাকে বলে তুমি তো রোজা রেখেছিলে, রোজা অবস্থায় আল্লাহকে ভয় পেতে বলেই তুমি তা ভাঙনি। তো জনগণের আমানতের খেয়ানত করলে তো আল্লাহ দেখছেন।
নয়া দিগন্ত : রমজান শেষ হওয়ার পর তাকওয়ার অনুভূতি আস্তে আস্তে কমে যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রগঠন ছাড়া শুধু ধর্মীয় ধারণা অনেকটা অসম্পূর্ণ এও কি আরেক কারণ?
মুফতি সাইফুল : দুটো বিষয় এবং তা হচ্ছে জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ না করা, হয়তো কেবল মনে করি না খেয়ে থাকার নাম রোজা, এটা জ্ঞানের স্বল্পতা। জাগতিক এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রোজাকে সীমাবদ্ধ করে রাখার ফলে এটা হয়। কুরআনের আয়াত, হাদিসের বাণীর ওপর দিয়ে শুধু ভেসে ভেসে যাচ্ছি। পড়ছি কিন্তু হৃদয়ঙ্গম করছি না। ওটার ভেতর যে অনুভূতি তৈরি করার ব্যাপার সেটা পারছি না। যারা সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতে যায়, যারা একটু সমুদ্রের পানিতে পা ভেজায়, আর যারা সমুদ্রে সাঁতার কাটে কিংবা যারা মধ্যসমুদ্রে গিয়ে তলদেশের সন্ধান করতে চায় সম্পদ আহরণের জন্য এদের প্রত্যেকের স্বাদ আলাদা। ইবাদতের গভীরে যতটা যাবেন ততটা উপকৃত হবেন। রাষ্ট্র বলেন, জনগণ বলেন, মুসলিম সমাজ বলেন, সমস্যা হচ্ছে ইবাদতের গভীরে প্রবেশ করছি না।
নয়া দিগন্ত : নিরন্তর অনুশীলনের অনুপস্থিতিও তো আছে।
মুফতি সাইফুল : রমজানে প্রশিক্ষণের মধ্যে আছি এমন অনুভূতিটাই অনেকের ভেতরে জাগছে না। রোজার মধ্যেও অনেক ভাইবোনের মধ্যে টেম্পার অনেক হাই থাকে। অথচ কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে এলেও তাকে বলার কথা আমি রোজা আছি। এটা সারা জীবনের জন্য প্র্যাকটিস করানো হয়। এরপরও বিভিন্ন মাসে নফল রোজা রাখেন অনেকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা। এমন রোজাদারও আছেন ঘুষের টাকা হাত দিয়ে ধরেন না ড্রয়ার খুলে রাখতে বলেন। তার মনে হচ্ছে রোজা রেখে ঘুষের টাকা ধরা যায় না, রোজা না রেখে ধরা যায়। আসল শিক্ষাটা পাননি। বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে। মৌলিক শিক্ষাটা নেয়া দরকার যা সাহাবারা পেয়েছিলেন। যা নবীজি সা: দিয়েছিলেন। আমরা বলি, আলোচনা করি কিন্তু কতটুকু গ্রহণ করতে পারি বা রাষ্ট্র গ্রহণ করতে পারছে এটা হলো বিষয়।



