দলীয় রাজনীতির ছায়ামুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চান বিশেষজ্ঞরা

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, এই প্রভাব কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। অনেকেই নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হতে পারে। একই সাথে স্থানীয় সরকারকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা এবং প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

দলীয় রাজনীতির ছায়ামুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চান বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, এই প্রভাব কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। অনেকেই নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হতে পারে। একই সাথে স্থানীয় সরকারকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা এবং প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দলীয় প্রতীকের কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের বাইরে থেকে যান এবং অযোগ্যরা সুযোগ পান। তার মতে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশের সুযোগ বাড়বে।

জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, তাদের দলে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়। নির্বাচিত হলে তিনি মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি নিরাপদ ও উন্নত ইউনিয়ন গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের রিকশাচালক কামাল বলেন, তিনি দলীয় প্রতীক নয়, বরং সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। একইভাবে, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা তরুণ আব্দুল মুত্তালিবের মতে, দলীয় মনোনয়নের কারণে অনেক সময় অযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নেন, যা স্থানীয় উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি তরুণবান্ধব ও জনগণের সাথে সংযুক্ত প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলেন। স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেনও সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেয়ার পক্ষে মত দেন।

স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। নির্বাচনী প্রচারণা, অনুদান এবং ব্যয়ের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সাময়িক গতি আসে। তবে এর নেতিবাচক দিক হলো, দলীয় রাজনীতির প্রভাবের কারণে স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে বাজার ও ঠিকাদারি খাতে আধিপত্য বিস্তার করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বরাবরই একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; বরং তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মহড়া। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব কতটুকু পড়বে- তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ইতিহাস বলছে, স্থানীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসে, কেন্দ্রীয় রাজনীতির উত্তাপ ততই ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি জনপদে।

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার গঠন বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী, কোনো স্থানীয় সরকার পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিষদ ভেঙে গেলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সাধারণত ৯০ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, সীমানা নির্ধারণ এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত, যা তাত্ত্বিকভাবে নির্বাহী হস্তক্ষেপমুক্ত একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে।

২০১৫ সালের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো মূলত নির্দলীয় ছিল। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় উন্নয়নে অবদানই তখন ভোটের প্রধান নিয়ামক ছিল। কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালুর পর থেকে এই চিত্রে বড় পরিবর্তন আসে। স্থানীয় নির্বাচন ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় রাজনীতি স্থানীয় নির্বাচনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি। প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচনী কৌশল- সবকিছুই অনেকাংশে নির্ধারিত হয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রিয় অনেক নেতা দলীয় প্রতীক না পেয়ে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রার্থীরাও কেন্দ্রের আশীর্বাদে মনোনয়ন পাচ্ছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে দলীয় কাঠামোর কারণে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ও বজায় থাকে-এটিও বাস্তবতা।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা যাচাই। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অনেক দলই নিজেদের জনপ্রিয়তার ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে বিবেচনা করে। ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য ধরে রাখতে চায়, যাতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার বার্তা দেয়া যায়। বিপরীতে, বিরোধী দল স্থানীয় বিজয়কে কেন্দ্রীয় আন্দোলনের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় সঙ্ঘাত বা সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে।

দ্বিতীয়ত, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান। কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন দেয়ার ফলে অনেক স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা বঞ্চিত হন এবং স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকেই মোকাবেলা করতে বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে এই কোন্দল আরো জটিল আকার ধারণ করে।

তৃতীয়ত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বা ব্যক্তিগত সুবিধার আশায় কিছু কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ভোটারদের আস্থা ক্ষুণœ করে।

সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টিতে স্থানীয় সরকারের প্রধান কাজ হলো রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিকসুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ভোটাররাও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় নিচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী নির্বাচিত হলে উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়া সহজ হয়। এই ‘সুবিধাবাদী’ মনোভাব কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাবকে আরো গভীর করে।

তবে এর বিপরীত প্রবণতাও রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা সুশাসনের ঘাটতি দেখা দিলে ভোটাররা স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সবশেষে বলা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও কেন্দ্রীয় রাজনীতি এখন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এর ইতিবাচক প্রভাব যেমন উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে, তেমনি নেতিবাচক প্রভাব গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করতে পারে। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রকের পরিবর্তে সহায়ক ও দিকনির্দেশক ভূমিকায় থাকতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে কতটা স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারবেন, সেটিই হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।