সংরক্ষিত নারী আসন ও সংসদীয় সভাপতিতে নজর এখন

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামী ১২ মার্চ। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে শুরু হতে যাওয়া এই অধিবেশনকে ঘিরে আনুষ্ঠানিক কার্যসূচির চেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বেশি আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী- এই দুই ইস্যুতে কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ নারী আসন ও কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারণই নতুন সংসদের ভেতরকার ক্ষমতার বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করবে।

কাওসার আজম
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামী ১২ মার্চ। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে শুরু হতে যাওয়া এই অধিবেশনকে ঘিরে আনুষ্ঠানিক কার্যসূচির চেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বেশি আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী- এই দুই ইস্যুতে কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ নারী আসন ও কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারণই নতুন সংসদের ভেতরকার ক্ষমতার বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করবে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১২ মার্চ বেলা ১১টায় শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবন-এ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে অধিবেশন শুরু হবে। তবে এর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনও এই অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন আইন অনুযায়ী সাধারণ আসনের আনুপাতিক হারে নির্ধারিত হয়- প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য। বর্তমান সংসদে বিএনপির সদস্য সংখ্যা ২১২ হওয়ায় তাদের প্রাপ্য প্রায় ৩৫টি নারী আসন; জোটগত সমর্থন বিবেচনায় তা আরো বাড়তে পারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি সাধারণ আসনের বিপরীতে প্রায় ১১টি নারী আসন পেতে পারে। এ ছাড়া এনসিপি ও স্বতন্ত্র সদস্যদের জন্যও একটি করে আসন পাবে। ফলে নারী আসন বণ্টন নিয়ে সরকার ও বিরোধী উভয় শিবিরেই অভ্যন্তরীণ তৎপরতা চলছে।

নারী আসন বণ্টনে ক্ষমতাসীন দল জামায়াত অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত জেলা থেকে মনোনয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে রংপুর ও খুলনা বিভাগ থেকে নারী আসনে প্রার্থী হতে সবচেয়ে বেশি লবিং চলছে।

জামায়াতে ইসলামী ১১ জন সংরক্ষিত নারী আসন পাচ্ছে। জানা যায়, দলের নারী নেত্রীদের পাশাপাশি ৫ আগস্ট-পরবর্তী আলোচিত নারী নেত্রীদেরও মনোনয়ন দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলীয় নেত্রীদের বাইরেও কয়েকজনকে দেখা যেতে পারে সংসদে।

অন্য দিকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা গঠনের পর বিএনপির বঞ্চিতদের একটি বড় অংশ ঠাঁই পেতে পারেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। ফলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ ঘিরে আগ্রহ আরো তীব্র হচ্ছে। সংসদীয় কমিটি কার্যত একটি ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠান, যার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কমিটি মন্ত্রণালয়ের ফাইল তলব করতে পারে, প্রয়োজনে শুনানি নিতে পারে। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকেন এবং সভাপতির কাছে জবাব দেন। ফলে সভাপতি পদটি কেবল আনুষ্ঠানিক মর্যাদা নয়; বাস্তবে এটি প্রশাসনিক তদারকির একটি শক্তিশালী অবস্থান।

গত দেড় দশকে সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে তারা সংসদ ভবনে পূর্ণাঙ্গ অফিস, একান্ত সচিব, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, অফিস সহায়ক এবং নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র প্রহরী পান। তাদের গাড়িতে জাতীয় সংসদের মনোগ্রামসংবলিত পতাকা ব্যবহারের বিধান রয়েছে; যা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীদেরও নেই। এ কারণে মন্ত্রিত্ব না পাওয়া জ্যেষ্ঠ নেতাদের জন্য এ পদকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ২১২টি আসনের বিপরীতে বিএনপি জোট প্রায় ৩৪টি কমিটির সভাপতির পদ পেতে পারে। ইতোমধ্যে একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখান থেকে বাছাই করে সভাপতিদের দায়িত্ব দেয়া হবে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে কয়েকজনকে সংসদের হুইপ বা অন্যান্য সাংগঠনিক দায়িত্বেও দেয়া হতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকার দলীয় চিফ হুইপ ও হুইপ কারা হচ্ছেন, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুক সরকারদলীয় চিফ হুইপ করা হয় কি না; তা নিয়েও রয়েছে জল্পনা।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বিভিন্ন জেলার জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্যরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো: আখতারুজ্জামান মিয়া (দিনাজপুর-৪), এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (নাটোর-২), একেএম সেলিম রেজা হাবিব (পাবনা-২), আমান উল্লাহ আমান (ঢাকা-২), রেজা কিবরিয়া (হবিগঞ্জ-১), ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক (কিশোরগঞ্জ-৩)সহ আরো অনেকে। দলীয় ভারসাম্য, আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবদান বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

এ দিকে জুলাই সনদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে বলে জুলাই সনদের ২৪ নম্বরে উল্লেখ আছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল এতে একমত পোষণ করেছে। জানা যায়, জামায়াতে ইসলামী সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে দলের আমির ডা: শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা ও নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের উপনেতা হয়েছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ চারটি কমিটিসহ আসন অনুপাতে মোট ১০টির বেশি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পাওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে দলের দুই নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ঠাঁই পেতে পারেন সেখানে।