অতিরিক্ত যানবাহনের অতিরিক্ত ধোঁয়া, নির্মাণ কাজের ধুলা, ইটভাটা ও শিল্প কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ভারী পদার্থ ঢাকার বাতাসকে ভারী করে তুলছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, গতকাল সোমবারও ঢাকা ছিল বিশ্বের চতুর্থ বায়ুদূষণের শহর। এই ইনডেক্সে গতকাল ঢাকার বায়ুমান ছিল ১৯৯। বায়ুমান ইনডেক্স অনুসারে ০ থেকে ৫০ পর্যন্ত ভালো ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত মাঝারি মান ধরা হয়, ১০১ থেকে ১৫০ পর্যন্ত সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হিসেবে ধরা হয়। ঢাকার এই বায়ুস্তরে স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের।
একিউআই লাইভ ডেসবোর্ড অনুযায়ী, গতকাল বুধবার ঢাকার সবচেয়ে দূষিত এলাকা ছিল দয়াগঞ্জ, গাবতলী, উত্তরা, মিরপুর, মতিঝিল, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, ধানমন্ডি ও কেরানীগঞ্জ। এই এলাকাগুলো ছাড়াও রাজধানীর মতিঝিল, হাটখোলা, তেজগাঁও, মহাখালী, ফার্মগেট, পল্লবী, কল্যাণপুর, ইস্টার্ন হাউজিং, বেচারামদেউরি এলাকা সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের এলাকা বলে চিহ্নিত হয়ে থাকে।
বায়ুদূষণ অনিয়মিত হার্টবিটের কারণ হয় এবং টিনএজারদের মৃত্যু ঘটাতে পারে। মৃত্যু ছাড়াও কার্ডিওভাস্কোলার রোগসহ ধোঁয়া থেকে নির্গত ক্ষুদ্র ভারী কণা ফুসফুসে ও রক্তে গিয়ে প্রদাহের সৃষ্টি করে থাকে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ব্যাপারে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউর রহমান বলেন, ঢাকার শহরের বায়ুদূষণ বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন মাত্রায় হয়ে থাকে। এ কারণে ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া এটা একটি কনটিনিউয়াস প্রসেস। সবসময় মনিটরিংয়ে রাখতে না পারলে বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব নয়।
মূলত ঢাকার বায়ুদূষণের দু’টি প্রধান উৎস রয়েছে শিল্পকারখানার নির্গমন এবং যানবাহনের নির্গমন। শিল্প উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ইটভাটা, সার কারখানা, চিনি, কাগজ, পাট ও টেক্সটাইল মিল, পোশাক তৈরির কারখানা, স্পিনিং মিল, ট্যানারি, গার্মেন্ট কারখানা, রুটি ও বিস্কুট কারখানা, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্প, সাভারের ট্যানারি শিল্প (আগে ছিল হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প এলাকা), সিমেন্ট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, ধাতব ওয়ার্কশপ, করাতকল থেকে উৎপন্ন কাঠের ধুলা, পেট্রোলিয়াম শোধনাগার, ডিস্টিলারি, রাবার শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, ইট উৎপাদন শিল্প এবং চারপাশের চাষের জমি থেকে উঠে আসা ধুলা রাজধানীতে চলে আসার কারণে রাজধানী প্রতিদিনই খুব বাজেভাবে দূষিত হয়ে থাকে। এ ছাড়াও বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল সংযোজন শিল্প থেকে ঢাকার বাতাস দূষিত হচ্ছে। এসব উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, বাষ্প, গ্যাস এবং ধূলিকণা নির্গত হয়, যা কুয়াশা ও স্মগ (ধোঁয়াশা) তৈরি করে থাকে।
ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় এখন আর কোনো ট্যানারি কারখানা না থাকলেও যে মাটি রয়ে গেছে সেখান থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, ক্লোরিনসহ অন্যান্য দুর্গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে তা থেকেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ঢাকার আশপাশে অসংখ্য ইটভাটা রয়েছে। এগুলোতে নিম্নমানের কয়লা এবং কাঠ ও টায়ার পোড়ানো হয়, যার ফলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও ক্ষতিকর ভারী পদার্থের কণা বাতাসে ছড়ায়।
শীতকালে দূষণের বড় অংশই এখান থেকে আসে। একটি দ্রুত বর্ধিষ্ণু শহর হওয়ায় ঢাকায় প্রচুর ভবন ও রাস্তা নির্মাণ চলছে। এসব নির্মাণস্থল থেকে ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সূক্ষ্ম কণিকা পিএম২.৫, পিএম১০ ছড়িয়ে পড়ছে। পিএম২.৫ সরাসরি ফুসফুসের সুক্ষ্ম পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে এবং রক্তে মিশে যাচ্ছে।
জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ সম্মত যানবাহনের অভাব রয়েছে। এই সুযোগে অনেক পুরনো বাস, ট্রাক ও লেগুনা এখনো রাস্তায় চলছে। এগুলো থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়, যা বায়ুদূষণের বড় উৎস। ঢাকার অনেক রাস্তা ভাঙা বা অপরিষ্কার।
গাড়ি চলার সময় এসব ধুলা বাতাসে উড়ে গিয়ে দূষণ বাড়ায়। মেগাসিটি হওয়ায় ঢাকায় প্রতিদিন ময়লা ও আবর্জনার স্তূপ গড়ে উঠে। এসব ময়লা ও আবর্জনা যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় পুড়িয়ে দেয়া হয়। সারাক্ষণ আবর্জনা পোড়ানোর ফলে সেখান থেকে ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়ে ঢাকার বাতাসকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। এতে করে অধিবাসীরা নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে হার্ট ডিজিজ, ফুসফুসের নানা রোগ হচ্ছে। উচ্চচাপ বেড়ে গিয়ে স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়াচ্ছে ঢাকার বাতাস।



