মীযানুল করীম
অর্থনীতি একটি রাষ্ট্রের প্রাণপ্রবাহ। সরকার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলেও তার অস্তিত্ব, কার্যকারিতা ও জনসমর্থন নির্ভর করে অর্থনৈতিক সমতার ওপর। ইতিহাস বলছে, অর্থনীতি যখন স্থিতিশীল থাকে তখন রাজনীতি শক্ত ভিত্তি পায়; আর অর্থনীতি দুর্বল হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান একই বিভাগে পাঠদান হতো- রাষ্ট্রচিন্তা ও অর্থনীতির এই অখণ্ড সম্পর্কের প্রতীক ছিল সেটি।
আজকের বাস্তবতায় সেই সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ। নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কেবল সংখ্যাতত্ত্বের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতা, সামাজিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন-দিকনির্দেশনার প্রশ্ন।
চ্যালেঞ্জের তালিকা দীর্ঘ, সঙ্কট গভীর
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মুখে। উচ্চ ও অস্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে; কিন্তু আয় বাড়ছে না। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় য়ে যাচ্ছে, নিম্নবিত্তের জীবন টিকে থাকার লড়াইয়ে পর্যবসিত হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, তারল্য সঙ্কট এবং দুর্বল তদারকি আর্থিক ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। আমানতকারীদের আস্থাহীনতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এক দিকে শিল্পে বিনিয়োগ কমছে, অন্য দিকে কর্মসংস্থানের গতি মন্থর।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কট উৎপাদন ব্যাহত করছে। সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ছে, রাজস্ব আহরণ কাক্সিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। পুঁজিবাজারে কারসাজি, শেয়ারবাজারে অনিয়ম, অর্থপাচার ও ‘হুন্ডি’ কার্যক্রম- সব মিলিয়ে অর্থনীতির রক্তরণ চলছেই।
তার ওপর আছে রাজনৈতিক অনাস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থার দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব- যা অর্থনৈতিক সংস্কারের পথকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
কাঠামোগত সংস্কারই একমাত্র পথ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সঙ্কট সামাল দিতে হলে ‘ফায়ারফাইটিং’ নয়, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার দরকার। শিল্প ও বাণিজ্য সক্রিয় করতে হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি নিতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে গভীর সংস্কার জরুরি- খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোরতা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদ, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
রাজস্ব আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমতা বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। একই সাথে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি অপরিহার্য।
নীতি-প্রশাসনে ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত
বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদ তার উত্তরসূরির জন্য একটি ‘নোট’ রেখে গেছেন- যেখানে অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। বিদায় সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরসহ অর্থ ও রাজস্ব বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ থেকে বোঝা যায়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অন্তত সঙ্কট সম্পর্কে সচেতনতা আছে।
কিন্তু সচেতনতা যথেষ্ট নয়- প্রয়োগই মূল কথা। অতীতে অনেক পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
মূল্যস্ফীতি : সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু
ম্যাক্রো অর্থনীতির সূচক যতই উন্নত দেখাক, বাজারে চাল-ডাল-তেল-সবজির দাম নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মানুষ সরকারের সাফল্য মেনে নেয় না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরবরাহ চেইন উন্নত করা, আমদানি-শুল্ক সমন্বয়, মজুতদারি ও কারসাজি বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি।
একই সাথে কৃষি ও উৎপাদন খাতে সহায়তা বাড়ালে স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে, আমদানি নির্ভরতা কমবে।
ব্যাংকিং খাত : সংস্কার ছাড়া গতি নেই
দুর্বল ব্যাংকের জন্য বিশেষ কৌশল নিতে হবে- মার্জার, পুনঃমূলধনীকরণ, অথবা প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রিত বন্ধের ব্যবস্থা। খেলাপিদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না করলে সংস্কার সম্ভব নয়। আমানতকারীর আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া অপরিহার্য।
অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা যদি অসুস্থ থাকে, উন্নয়ন থমকে যাবে- এ সত্য এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: তরুণদের ভবিষ্যৎ
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বড় শক্তি, আবার বড় চাপও। কর্মসংস্থান না বাড়লে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহজ ঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা, রফতানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা- এসবের সমন্বিত নীতি দরকার।
বিদেশী বিনিয়োগ টানতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীরা আস্থা খোঁজে, অনিশ্চয়তা নয়।
শেষ কথা- চ্যালেঞ্জ নতুন নয়, কিন্তু সময় কম। সঙ্কটকে অজুহাত বানিয়ে স্থবিরতা টিকিয়ে রাখা যাবে না। অর্থনীতি টেকসই করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সমতা বাড়াতে হবে, কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে, যে খাত যত গুরুত্বপূর্ণ তাকে তত গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের সামনে এখন অগ্নিপরীা- এই চ্যালেঞ্জ জয় করতে পারলে রাজনীতি শক্ত ভিত্তি পাবে, ব্যর্থ হলে জনঅসন্তোষ বাড়বে। অর্থনীতি তাই শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি সরকারের অস্তিত্বের প্রশ্ন।



