তেল, চিনি, ছোলা, ডালের বাড়তি মজুদ : তবুও বাড়ছে দাম

দেশে বছরে সর্বোচ্চ সাত লাখ টন মসুর ডালের চাহিদা থাকলেও রমজানে কিছুটা বাড়তি চাহিদা থাকে। তা ৮০ হাজার টনের কাছাকাছি। স্থানীয়ভাবে প্রায় দেড় লাখ টন মসুর ডাল উৎপাদিত হওয়ার পাশাপাশি সর্বশেষ গেল জানুয়ারি মাসেই আমদানি হয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৯৪২ মে: টন। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে আরো তিনটি জাহাজ বোঝাই ৫৬৪ হাজার ৭৪৬ মে: টন। রোজার মাসের চাহিদার তুলনায় ইতোমধ্যে দেশে দ্বিগুণ মসুর ডাল ঢুকেছে।

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো

পবিত্র রমজান সামনে রেখে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য আমদানি হলেও অব্যাহতভাবে বাড়ছে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা ও ডালের দাম। নির্বাচন কেন্দ্রিক সরকারের ব্যস্ততার সুবাদে সক্রিয় অসাধু সিন্ডিকেট এই দাম বাড়ার পেছনে জড়িত; বলছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

দেশে বছরে চাহিদা সর্বোচ্চ সাত লাখ টন মসুর ডালের চাহিদা থাকলেও রমজানে কিছুটা বাড়তি চাহিদা থাকে। তা ৮০ হাজার টনের কাছাকাছি। স্থানীয়ভাবে প্রায় দেড় লাখ টন মসুর ডাল উৎপাদিত হওয়ার পাশাপাশি সর্বশেষ গেল জানুয়ারি মাসেই আমদানি হয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৯৪২ মে: টন। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে আরো তিনটি জাহাজ বোঝাই ৫৬৪ হাজার ৭৪৬ মে: টন। রোজার মাসের চাহিদার তুলনায় ইতোমধ্যে দেশে দ্বিগুণ মসুর ডাল ঢুকেছে।

এ ছাড়া গত তিন মাসে প্রায় সাড়ে ৬৬ হাজার মে: টন মটরডাল আমদানি হয়েছে।

রমজানে চিনির চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন। গত তিন মাসেই আমদানি হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ মে: টন। এর বাইরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে আরো ৩৭ হাজার মে: টন। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে- প্রায় দুই লাখ মে: টন চিনি।

গতকাল খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চিনি বিক্রি হয়েছে মন (৩৭ কেজি ৩২০ গ্রাম) প্রতি তিন হাজার ৫৮৫ টাকা দরে। আর লোকাল পাইকারি দোকানে ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৯৫০ টাকা। দোকানিরা জানায়, প্রতি কেজি চিনির ক্রয়মূল্য ৯৯ টাকা টাকা। এর সাথে কেজিপ্রতি দুই টাকা খরচ হিসাব করেন দোকানিরা। আর খোলা বাজারে বড় দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ১০২-১০৫ টাকা পর্যন্ত। তবে বিভিন্ন গলির দোকানে ১১০ টাকা কেজিতে চিনি বিক্রি হচ্ছে। যা গত দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ৯২ টাকা।

রমজানে দেড় থেকে দুই লাখ টন ছোলার চাহিদা থাকে। গত ডিসেম্বর থেকেই রমজান সামনে রেখে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের পাশাপাশি ছোলা আমদানি করে মজুদ গড়তে থাকেন আমদানিকারকরা। গত জানুয়ারি মাসেই আমদানি হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার মে: টন। এর আগে ডিসেম্বর মাসে আমদানি হয়েছে ৫৭ হাজার মে: টনের বেশি ছোলা। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে আরো ৪৬ হাজার মে: টন। ফলে বাজারে ছোলার কোনো সঙ্কট নেই। কিন্তু গত কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজি প্রতি পাইকারিতেই আট টাকা বেড়েছে। ফলে ভালো মানের ছোলা প্রতি কেজি ১০২-১০৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে।

রমজানে খেজুরের চাহিদা ৭৫ হাজার টনের মতো। গত আড়াই মাসেই আমদানি হয়েছে ৪০ হাজার টনের মতো খেজুর। পথে আছে আরো প্রায় ২০ হাজার টনের মতো। সরকার বিনা শুল্কে খেজুর আমদানির সুযোগ দিলেও বাজারে এর প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

এ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার খবরেই অসাধু ব্যবসায়ীরা মণপ্রতি ৩০০ টাকার বেশি বাড়িয়ে দিয়েছেন সয়াবিন ও পামতেলের দাম। তবে মিল মালিকরা বলছেন বিশ্ববাজারের বাড়তি দামের প্রভাব এখনো বাজারে আসেনি। আমাদের দেশে সাধারণত রোজার মাসে প্রায় তিন লাখ মে: টন ভোজ্য তেলের চাহিদা থাকে। কিন্তু আমদানি হয়েছে এর চেয়ে অনেক বেশি। গত ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসেই প্রায় পৌনে চার লাখ মে: টন ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে বলে সূত্র জানায়। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে- তিনটি ট্যাংকার বোঝাই প্রায় এক লাখ মে: টন সয়াবিন তেল। কিন্তু তবুও রহস্যজনক কারণে বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পবিত্র রমজান সামনে রেখে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি হলেও রহস্যজনক কারণে দাম বাড়ছে। সরকারের বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগ অসাধু ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন জানিয়ে সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহে সয়াবিন, পাম ও সুপার পামের দাম মণপ্রতি বেড়েছে ৩০০ টাকা। ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের বুকিং রেট বেড়েছে। গতকাল পর্যন্ত সয়াবিনের বুকিং রেট ছিল প্রতি টন ১১৫০ ডলার এবং পাম অয়েল প্রতি টন ১১৩০ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দেয়ার অন্তত একমাস পর সেই রেটের পণ্য আমাদের দেশে আসে। কাজেই বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার সাথে সাথেই আমাদের দেশে এর প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পবিত্র শবই মেরাজের পর হতে সয়াবিন, পাম তেল, সুপার পাম এবং ডালের দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিনের মধ্যে পাঁচ লিটারের বোতল কোম্পানি ভেদে ৯৩০ থেকে ৯৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা কিছুদিন আগেও কোম্পানি ভেদে ২৫ টাকা কম ছিল।

এ দিকে গতকাল রোববার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ সাত হাজার ৫০ টাকা। পাম তেল বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার ৯১০ টাকা এবং সুপার পাম তেল বিক্রি হয়েছে ছয় হাজার ১৯০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন ১৯২ টাকা প্রতি কেজি সয়াবিনের ক্রয়মূল্য এবং তারা বিক্রি করছেন ১৯৬ টাকা প্রতি কেজি। পাম তেলের প্রতি কেজি ক্রয়মূল্য ১৫৮ টাকা এবং বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়। সুপার পাম তেল প্রতি কেজি ক্রয়মূল্য ১৬৬ টাকা খোলা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়।

পাইকারি ব্যবসায়ী দিদারুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করলে মানুষ স্বস্তি পাবে। নইলে রমজানে মানুষের কষ্ট বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ছোলার দাম রমজান শুরুর পর চাহিদা হ্রাস পাবে বিধায় কমতে পারে বলেও তিনি জানান।

টি. কে. গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তছলিম নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের বুকিং রেট ১৫০ ডলার পর্যন্ত টনপ্রতি বেড়েছে। কিন্তু এর প্রভাব তো এখন পর্যন্ত বাজারে নেই এবং সামনে রমজানেও বাজারে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জানান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীরা অনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের সরবরাহ সঙ্কট সৃষ্টি করেন। ফলে চাহিদা অনুযায়ী জোগান না থাকার অজুহাতে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেন। এ ক্ষেত্রে মজুদকে জোগানে রূপান্তর করতে সরকারের নজরদারি অত্যাবশ্যক বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা মোটেই কঠিন কিছু নয়।