অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের টানা উন্নতির পর যথারীতি সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে পুঁজিবাজারগুলোতে এ সংশোধন ঘটে। সূচকের উন্নতি দিয়ে দিন শুরু করা বাজারগুলো লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে এ সংশোধনের শিকার হয়। দুই পুঁজিবাজারের সবগুলো খাতেই সংশোধন ঘটেছে গতকাল। ব্যতিক্রম ছিল একমাত্র মিউচুয়াল ফান্ড। এ খাতটিতে বেশির ভাগ ফান্ডই গতকাল উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে এ সংশোধন ঘটেছে বাজারে।
গতকাল লেনদেনের শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য পুঁজিবাজারগুলোতে সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও পরবর্তিতে বাজারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। প্রথম দিকে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এ চাপ সাময়িকভাবে সামলে নেয় বাজরগুলো। ঢাকা শেয়ারবাজারে পাঁচ হাজার ২৬৬ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বেলা ১১টার দিকে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ২৯৩ পয়েন্টে। এ সময় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ২৭ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে ফের বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। দিনের বাকি সময় বাজার আর বিক্রয়চাপ সামলে উঠতে পারেনি। এ সময় বিনিয়োগকারীরা বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মুনাফা তুলে নিতে সক্রিয় হলে পতনের মাত্রাও আরো বেড়ে যায়। আর এভাবে উভয় বাজারেই প্রধান সূচকটির বড় ধরনের অবনতি ঘটে।
গতকাল দুই পুঁজিবাজরে সূচকের আচরণ ছিল কিছুটা মিশ্র। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩২ দশমিক ৩০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ২৬৬ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ২৩৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটির ১৯ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট পতন ঘটলেও এক দশমিক ৭৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে ডিএসই শরিয়াহ সূচক। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ২৯ দশমিক ৫১ পয়েন্ট হারায়। ১৪ হাজার ৭৬০ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৭৩১ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ৫৯ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও সিএসসিএক্স হারায় ২২ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট।
দিনের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল সূচক পতনে রোববারের মতো ব্যাংকিং খাতের অবদানই ছিল বেশি। ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মতো বড় মূলধনের কোম্পানি তো বটেই, এ খাতের অন্য কোম্পানিগুলোও কম বেশি সংশোধনের শিকার হয়েছে গতকাল। খাতটির ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে নামমাত্র মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে তিনটি কোম্পানির। বড় দরপতনের শিকার হয়েছে বীমা খাতও। এ খাতের ৫৮টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে চারটির। অন্য খাতগুলোতেও বেশির ভাগ কোম্পানি দর হারালেও সূচকের পতনে ব্যাংক ও বীমা খাতের ভূমিকা ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি। ব্যাংক বীমার পাশাপাশি সিমেন্ট খাতও গতকাল দরপতনের শিকার ছিল।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচন দ্রুতই এগিয়ে আসছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আর তিনটি কর্মদিবস পাবে পুঁজিবাজার। তাই যে যার অবস্থান থেকে ঝুঁকি কমাতে চাচ্ছেন। নির্বাচনের দিন বা নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও অস্বস্তি রয়েছে, যার প্রতিফলন ছিল দিনের বাজার আচরণে। একই কারণে নির্বাচনের আগে সামনের কয়েকটা দিনও কিছুটা মন্দার মধ্য দিয়ে পার করতে পারে বাজার। তবে তারা মনে করেন, নির্বাচন পর্যন্ত এ ধরনের অস্বস্তি থাকলেও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হলে বাজার আবার ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
এ দিকে সূচক পতনের দিনটিতে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে দুর্বল খাত মিউচুয়াল ফান্ড। গতকাল এ খাতে প্রায় শত ভাগ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। এ ছাড়া ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশটি সিকিউরিটিজের আটটিই ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। এমনিতে বছরের পর বছর ধরে মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই। তার ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা সংশোধনে কোজ অ্যান্ড ফান্ড তালিকাভুক্তি রহিত করার ঘোষণা আসার পর এ খাত আরো বড় সমস্যার মুখোমুখি। এ মুহূর্তে তালিকাভুক্ত ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র তিনটি ফান্ড অভিহিত মূল্যের উপরে লেনদেন হচ্ছে। অন্য ফান্ডগুলোর বেশির ভাগই দুই টাকা থেকে সাত টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু গতকাল হঠাৎ করে মূল্যবৃদ্ধিতে এ খাতটিই শীর্ষে উঠে আসে।
গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ। ২২ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৫ লাখ ২১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২০ কোটি সাত লাখ টাকায় ৩৮ লাখ তিন হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ইসলামী ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ওয়ালটন হাইটেক, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও কে অ্যান্ড কিউ।
এ দিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। ফান্ডটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড, এসইএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, ইসলামিক ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ওয়ালটন হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং, আলহাজ টেক্সটাইলস, আইসিবি সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড।
দিনের দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের রিজেন্ট টেক্সটাইলস। গতকাল ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ছয় দশমিক ৬ শতাংশ দরপতনের শিকার টেক্সনোড্রাগ ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশ সিকিউরিটিজের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আরামিট সিমেন্ট, তুং হাই নিটিং, রহিম টেক্সটাইলস, নর্দার্ন জুট, এবি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকস, মোজাফফর হোসাইন স্পিনিং মিলস ও ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স।



