বরিশাল-৩ আসনে লড়াই হবে ধানের শীষ ও ঈগলের

Printed Edition

ভূঁইয়া কামাল মুলাদী (বরিশাল)

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে ভোটের উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। এ আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মূল লড়াই গড়ে উঠেছে বিএনপির ধানের শীষ ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এ বি পার্টি) ঈগল প্রতীকের মধ্যে। প্রচারণা, সমীকরণ ও ভোটারদের আগ্রহে এ আসনটি এখন দণিাঞ্চলের আলোচিত কেন্দ্রবিন্দুতে।

এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন (ধানের শীষ), এ বি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ওরফে ব্যারিস্টার ফুয়াদ (ঈগল), জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কিবরিয়া টিপু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) উপাধ্য মাওলানা মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন (ট্রাক) এবং বাসদের মো: আজমুল হাসান জিহাদ (মই)।

ধানের শীষে ঐতিহ্য, তবে চ্যালেঞ্জ কম নয় : বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন একজন পরিচিত ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে ‘মুলাদী-বাবুগঞ্জ বিএনপির ঘাঁটি’- এ ধারণার ওপর ভর করে দলটির প্রার্থিতা ও প্রচারণা কিছুটা ধীরগতিতে শুরু হয়। প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিলম্ব, দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং প্রার্থীর শারীরিক অসুস্থতা- সব মিলিয়ে শুরুতে মাঠে সক্রিয়তা কম ছিল তাদের। এর মধ্যে বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আ: ছত্তার খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করে প্রচারণা শুরু করলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি সরে গিয়ে জয়নুল আবেদীনের পে মাঠে নামেন। তবুও দলীয় অতীত বিভাজনের স্মৃতি অনেক ভোটারের মনে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ ও ২০০৮ সালে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জয়নুল আবেদীনের স্বতন্ত্র নির্বাচন করা এবং ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী সেলিমা রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সৃষ্ট বিভক্তির রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সে সময় অল্প ভোটের ব্যবধানে বিএনপির পরাজয় দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মনে তের মতো রয়ে গেছে।

ঈগলে জোয়ার, নতুন সমীকরণ : এ বি পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও স্বল্প সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তিনি। উচ্চশিতি, স্পষ্টভাষী ও সক্রিয় এই তরুণ নেতা নদীভাঙন রোধ, মিরগঞ্জ সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতা তার পে ইতিবাচক জনমত তৈরি করেছে।

১১ দলীয় রাজনৈতিক সমঝোতায় জামায়াতে ইসলামী এ বি পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ায় ভোটের মাঠে নতুন গতি এসেছে। জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী অধ্য মাওলানা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর প্রকাশ্যে ব্যারিস্টার ফুয়াদের পে গণসংযোগে নামায় দলীয় কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা ফিরে আসে। জামায়াতের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর ভর করে ঈগল প্রতীক শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেকরা।

অন্য প্রার্থীদের অবস্থান : জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু তিনবারের সংসদ সদস্য হলেও বর্তমানে কারাগারে থাকায় তার পে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন দলীয় নেতাকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণ-অধিকার পরিষদ ও বাসদের প্রার্থীরাও নিজ নিজ সমর্থকদের নিয়ে উঠানবৈঠক, গণসংযোগ ও মাইকিং চালিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি গান ও জারি গানের সুরে নিজেদের কথা তুলে ধরে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তারা।

জরিপ ও ভোটারদের অপো : সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের জরিপে ঈগল প্রতীক এগিয়ে থাকার আভাস মিললেও স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, সব হিসাব-নিকাশের চূড়ান্ত জবাব দেবেন ভোটের দিন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে ভোট হলে প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত হবে বলে মনে করছেন সবাই।

সব মিলিয়ে বরিশাল-৩ আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় নয়, ব্যক্তিগত ইমেজ, জোট রাজনীতি ও স্থানীয় ইস্যুর মেলবন্ধনে এক উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।