এইচ এম আবু ছিদ্দিক
আজ যখন আমরা ‘স্মার্ট কক্সবাজারের’ স্বপ্ন দেখছি, তখন পাহাড় কাটা, মাদকের বিস্তার আর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক উন্নয়ন, যা প্রকৃতি ধ্বংস না করে নিরাপত্তা ও পর্যটনের বিশ্বায়ন নিশ্চিত করবে। উপকূলীয় নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার। এক্ষেত্রে টেকসই কংক্রিট ব্লক আর সবুজ ম্যানগ্রোভ বেষ্টনীর মাধ্যমে একটি অভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি বেজড’ রক্ষণাবেক্ষণ মডেল এবং স্মার্ট আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চালু করাও দরকার। সাথে যুক্ত করতে হবে ‘ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট আর্কিটেকচার’। পাহাড়ের পাদদেশে বা উপকূলীয় অঞ্চলে এমন ‘স্মার্ট বিল্ডিং কোড’ প্রণয়ন করতে হবে, যা জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগেও অটুট থাকে।
প্রকৃতি অক্ষত রেখে যাতায়াতব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে চট্টগ্রাম টানেলের মুখ (আনোয়ারা) থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সাগরের পাড় ঘেঁষে একটি ‘স্মার্ট কোস্টাল ফ্লাইওভার’ নির্মাণ সম্ভাবনাময়। এ ফ্লাইওভার যেমন কৃষিজমি রক্ষা করবে, আবার পাহাড় কাটার আত্মঘাতী প্রবণতা বন্ধ করবে। এজন্য একটি ‘পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা’ করতে হবে।
বিশ্বের দীর্ঘতম ˆসকত ঘিরে কক্সবাজারকে একটি আন্তর্জাতিক হাবে রূপান্তর করতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু আধুনিক পরিকল্পনা :
শহরজুড়ে উচ্চগতির ফ্রি ওয়াই-ফাই, কিউআর কোডভিত্তিক তথ্যসেবা এবং এআই চালিত ফেশিয়াল রিকগনিশন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা দরকার। একটি ইউনিফাইড অ্যাপ বা ‘স্মার্ট কার্ড’ যার মাধ্যমে পর্যটকরা হোটেল বুকিং থেকে শুরু করে কেনাকাটা, সব পেমেন্ট ক্যাশলেস পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। এতে সরকারি রাজস্ব আদায়ে নির্ভুল তথ্য পেতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। উপকূলে ‘উইন্ড মিল’ এবং ভাসমান সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে রিনিউয়েবল এনার্জি উৎপাদন করে শহরের বিদ্যুৎচাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে। পরিবেশবান্ধব মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম, আধুনিক ক্রুজ শিপ সার্ভিস এবং রাখাইন পল্লীসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ঘিরে ‘কালচারাল ও হেরিটেজ ট্রেইল’ তৈরি করা সময়ের দাবি।
সেন্টমার্টিন ও মূল সৈকতে ‘জিরো-ওয়েস্ট’ নীতি কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি হোটেলে সেন্ট্রাল সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যাতে বর্জ্য সরাসরি সাগরে না মেশে। এ ছাড়া, কক্সবাজারে একটি বিশ্বমানের ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে; যা সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও গবেষণায় ‘ব্লু-টেকনোলজি’ ব্যবহার করবে। কক্সবাজারের সামুদ্রিক টুনা, কোরাল ও লাক্ষা মাছ উচ্চমানের ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং লিন প্রোটিনের উৎস। এ প্রাকৃতিক সম্পদ ঘিরে ‘হেলথ ট্যুরিজম’ বা ‘ব্লু-ডায়েট’ ধারণা জনপ্রিয় করার কর্মসূচি নিতে হবে। পাশাপাশি লবণ চাষ ও শুঁটকি উৎপাদনে আধুনিকায়নে স্থানীয়দের লাভবান হতে সহায়তা করবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও আধুনিক আইকনিক রেলস্টেশন আমাদের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এ অর্থনীতির মূল কারিগর মৎস্যজীবীরা আজও অবহেলিত। গভীর সাগরে মাছ ধরার প্রতিটি ট্রলারে কম খরচে জিপিএস (জিপিএস) ভিত্তিক ট্র্যাকিং ডিভাইস এবং ‘এসওএস’ বাটন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ বীমা এবং স্থানীয় যুবকদের জন্য বিশেষায়িত ‘ট্যুরিজম ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
উন্নয়নে বড় বাধা মাদক ও চোরাচালান। এ জন্য স্মার্ট সার্ভিল্যান্স প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্ত নিশ্ছিদ্র করা এবং পর্যটকদের জন্য ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে একটি দক্ষ ‘কোস্টাল টাস্কফোর্স’ গঠন করতে হবে। উন্নয়ন আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে আমাদের পাহাড় থাকুক অটুট। সমুদ্র থাকুক দূষণমুক্ত। সীমান্ত থাকুক সুরক্ষিত।
লেখক : সাংবাদিক



