প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন এক মাস হলো। তিনি জীবনের প্রথম দু’টি আসনে নির্বাচন করে দু’টিতেই বিজয়ী হয়ে প্রথম সংসদ নেতা, প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের পাঁচ বছরের মেয়াদের প্রথম এক মাস বা হানিমুন পিরিয়ড কিভাবে কাটাচ্ছেন তা নিয়ে গ্রামগঞ্জ, পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সবমহলে আলোচনা হচ্ছে। দেশবাসী মূল্যায়ন করছেন, হিসাব-নিকাশ করার চেষ্টা করছেন— প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের চাল-চলন, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ইত্যাদিরও।
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতের প্রধানমন্ত্রীর মতো ক্ষমতার জৌলুস, আমিত্ব, অহঙ্কার, ক্ষমতার দাপট, গতানুগতিক নিয়মের ভাবসাব পরিহার করে, সচেতনভাবে একজন সাদাসিধা মানুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার বিষয়টি মাথায় রেখে তারেক রহমানকে তার পোশাক-আশাক ও চলন-বলন, কর্মতৎপরতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হচ্ছে। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিরোধীদলীয় নেতাদের বাসভবনে গিয়ে আন্তরিক পরিবেশে কথা বলে এক নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের জন্ম দিয়েছেন। যা অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সম্মান প্রদর্শন ও সৌজন্যবোধের যে নতুন সংস্কৃতি তিনি চালু করেছেন, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন— বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য (এমপি) ডিউটি ফ্রি (শুল্কমুক্ত) গাড়ি বা প্লট নেবেন না। অথচ প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য ডিউটি ফ্রি (শুল্কমুক্ত) গাড়ি বা প্লট পাওয়া ছিল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভাবনায় রেখে জনস্বার্থে প্রথম সিদ্ধান্তটিই ছিল চমকপ্রদ। শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেয়ার ঘোষণা সরকারের স্বচ্ছ মানসিকতা ও কৃচ্ছ্রতার পথে অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। একই সাথে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিজের গাড়িতে যাতায়াত করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের গাড়ি কমিয়ে এনেছেন এবং তার চলাচলের সময় রাস্তার দুই পাশে সারি করে পুলিশ সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্তও বাতিল করেছেন।
বিগত বছরগুলোতে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাস্তায় চলাচলের সময় দুই পাশ আটকে জনশূন্য করে দাপিয়ে চলার যে দাম্ভিক কালচার গড়ে তুলেছিলেন, তারেক রহমান তা পরিহার করছেন। ভিভিআইপি প্রটোকলের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল যেন ব্যাহত না হয় সেজন্য যাত্রাপথে প্রটোকল এবং বিশাল পুলিশ বহরের যে আধিক্য ছিল, তা কমিয়ে এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজ বহরে প্রটোকলের ১৩-১৪টি গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে মাত্র চারটি নির্ধারণ করেছেন। তিনি সাধারণভাবে চলাচলের সময় গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করে, কেবল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় জাতীয় পতাকা ব্যবহার হবে বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে এবং ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজটের বিষয়টি সামনে রেখে মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক হলে মন্ত্রীদের সচিবালয় থেকে আসা-যাওয়ার পথে একটি জট সৃষ্টি হয়, ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়ে। সেসব কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী বেশির ভাগ সময় সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেন। একই সাথে সরকারি ছুটির দিন প্রতি শনিবার প্রধানমন্ত্রীর অফিস করছেন। তিনি নিজে সকাল ৯টা থেকে সোয়া ৯টার মধ্যে অফিসে পৌঁছান। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে একদিকে প্রশাসনিক সংস্কার, অন্যদিকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দ্রুততার সাথে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তৎপর হয়েছেন। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেন।
এর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যদিও নির্বাচনের সময় বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিকে অবাস্তব বলে সমালোচনা করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
গত ১৪ মার্চ মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতার মাসিক সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি আরো একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছেন। এছাড়া খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এই সব জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষ তথা প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর ক্ষমতায় আসা নির্বাচিত এই সরকারের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। প্রধানমন্ত্রীও জনপ্রত্যাশা পূরণে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রবাদ আছে ‘Morning shows the day’ অর্থাৎ— সকাল দেখেই দিনটি কেমন যাবে তা বোঝা যায়। তেমনি নতুন সরকারের শুরুটা দেখেই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তারেক রহমানকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষ করে বিএনপির প্রতিশ্রুত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে হবে। আর এ জন্য দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও রফতানি বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে বিভেদের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির বুনিয়াদ রচনা করতে হবে। আমরা আশা করি, তারেক রহমান তার বর্তমান নিজস্ব গুণাবলির মাধ্যমে সৌজন্য, বিনয় ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে জাতিকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন। একই সাথে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সুফল দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট



