বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হয়- তথ্যের আসল উৎস কোথায়? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নাকি বিদেশী মিডিয়া? এ দ্বন্দ্বই ব্যঙ্গাত্মকভাবে সামনে এনেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিজ। তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য- ‘আমি কি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কথা বিশ্বাস করব, নাকি নাওমি এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার কথা বিশ্বাস করব?’
মাত্র একটি বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের নির্বাচন-রাজনীতির গভীর সঙ্কট : বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট। প্রথমত, নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাত্ত্বিকভাবে এটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন। কিন্তু বিগত দেড় দশকে বিরোধী দল, সুশীলসমাজ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ— কমিশন অনেক সময় সরকারের বা কোনো পক্ষের রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিধ্বনিত করেছে। ফলে কমিশনের ঘোষিত পরিসংখ্যান, ভোটার উপস্থিতি বা নির্বাচনের ‘সুষ্ঠুতা’ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। অর্থাৎ আইনি কর্তৃত্ব থাকলেও নৈতিক আস্থায় ঘাটতি দেখা দেয়।
দ্বিতীয়ত, বিদেশী গণমাধ্যম। বিশেষ করে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের বড় সংবাদপত্র বা পশ্চিমা সাংবাদিকদের রিপোর্ট অনেক সময় বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রে আসে। কিন্তু এসব প্রতিবেদনও সবসময় নিরপেক্ষ নয়— কূটনৈতিক স্বার্থ, ভূরাজনৈতিক অবস্থান কিংবা নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিদেশী রিপোর্টও অনেকের কাছে ‘আরেকটি বয়ান’ মাত্র।
ড্যানিলোভিজর মন্তব্য আসলে এ দুই বাস্তবতার মাঝখানের শূন্যতাকে নির্দেশ করে। তিনি সরাসরি কাউকে অভিযুক্ত করেননি; বরং প্রশ্ন তুলেছেন— দুই পক্ষের মধ্যে যদি পক্ষপাত থাকে, তাহলে সত্য কোথায়? তার ব্যঙ্গের ভেতরে লুকিয়ে আছে হতাশা : তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব। তার মন্তব্য এসেছিল বাংলাদেশের নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময়টাতে।
এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ একটি সুস্থ নির্বাচনী ব্যবস্থার মূলভিত্তি হলো জনআস্থা। ভোটার যদি মনে করেন ফল আগেই নির্ধারিত, কিংবা তথ্য বিকৃত— তাহলে অংশগ্রহণ কমে যায়, বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তখন নির্বাচন আর রাজনৈতিক সমাধান নয়, বরং সঙ্ঘাতের উৎসে পরিণত হয়।
সুতরাং সমস্যার সমাধানে বিদেশী বা রাষ্ট্রীয় বয়ানকে অন্ধভাবে যদি মানা হয়; তখন সঙ্কট সামনে আসে। এ কারণে প্রয়োজন স্বচ্ছতা— স্বাধীন পর্যবেক্ষক, উন্মুক্ত ডাটা, গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার এবং কমিশনের জবাবদিহি। সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে প্রশ্নই না ওঠে।
একটি ছোট টুইট একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে : বাংলাদেশের নির্বাচন আজ কেবল ভোটের লড়াই নয়, বিশ্বাসেরও লড়াই। আর বিশ্বাস হারালে গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। নির্বাচন-উত্তর সময়ে এটি বড়ভাবে দেখা যাচ্ছে।
দুই.
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফল এখন সবার জানা। বিভাগভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— দেশজুড়ে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ২৯৯ আসনের মধ্যে ২১৩টি আসন পেয়ে এককভাবে সরকার গঠনের সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। অন্য দিকে ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। বাকি আসনগুলোতে সীমিত উপস্থিতি রয়েছে অন্যদের। ঘোষিত এ ফলের নিরিখে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রবণতা বিচার করলে রাজধানীকেন্দ্রিক মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি আর দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলক বেশি হয়েছে।
ঢাকা বিভাগে ৭০ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট জিতেছে ৫৪টি। ১১ দল পেয়েছে ১৩টি এবং অন্যান্যরা তিনটি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টির মধ্যে ৫০ আসন পেয়েছে বিএনপি জোট, আর ১১ দল পাঁচটি ও অন্যান্য তিনটি পেয়েছে। রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে বিএনপি ২৮ এবং ১১ দল ১১টি পেয়েছে। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলক শক্ত ছিল।
খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৪ আর ১১ দল ২২টি পেয়েছে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৩টি, ১১ দল ১৯, অন্যরা একটি আসন পেয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৮টি পেয়েছে। বাকিটা পেয়েছে অন্যরা। বরিশাল বিভাগের ২১ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৮টি, ১১ দল দু’টি, ইসলামী আন্দোলন একটি পেয়েছে। সিলেট বিভাগের ১৯ আসনের মধ্যে ১৮টি বিএনপির দখলে।
এই ফল অনুসারে সারা দেশে বিএনপি জোটের শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে শহরাঞ্চল, তরুণ ভোটার ও পরিবর্তনপ্রত্যাশী জনগোষ্ঠীর সমর্থনে। অন্য দিকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১১ দল স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু এ চিত্রই কি বাস্তব?
এই ফল বলছে- জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্পষ্ট, অঞ্চলভেদে ভোটের মনস্তত্ত্ব আলাদা, ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ, সব মিলিয়ে বিভাগভিত্তিক ফল একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে রাজধানী ও পূর্বাঞ্চলের শক্ত সমর্থন বিএনপির বিজয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
তিন.
এবারের নির্বাচনের সাথে প্রাক-নির্বাচনের বিশ্লেষণের কিছুটা ব্যবধান লক্ষ করা যায়। এ সময় তিনটি সম্ভাবনার কথা মৌলিকভাবে সামনে এসেছিল।
প্রথমত, বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে। দ্বিতীয়ত, জামায়াত জোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তৃতীয়ত, এমন একটি ফল আসবে যাতে বিএনপি ও জামায়াত জোটকে সমঝোতার সরকার গঠন করতে হবে। অর্থাৎ ১২০—১৪০ এর মধ্যে দুই দলের আসন সীমিত থাকতে পারে।
শেষোক্ত ক্ষেত্রে বিএনপি জামায়াতকে বাদ দিয়ে বাকি দলগুলো নিয়ে সরকার গঠনের কথা বিবেচনা করে। জামায়াত বিএনপিসহ একটি জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানায়।
নির্বাচনের শেষ সপ্তাহ নাগাদ অন্তরালের সমঝোতা নতুন একটি মেরুকরণের দিকে নিয়ে যায় পরিস্থিতিকে। বলা হচ্ছে— প্রতিবেশী দেশের লবি আওয়ামী লীগকে এবং সংখ্যালঘু বলয়কে ভোট বর্জন বা প্রতিরোধের পরিবর্তে বিএনপিকে সমর্থনের দিকে নিয়ে যায়। এ সমঝোতার বিনিময় হিসাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আনার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। অঘোষিতভাবে গণভোটে ‘না’ পক্ষ সমর্থন দেয়া হয়। এর ফলে যেসব অঞ্চলে এ সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় বিশেষত- চট্টগ্রাম, সিলেট ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর অঞ্চলে; যেখানে ১১ দলের ফলে এক রকম বিপর্যয় নামে। আর রংপুর রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে এটি আংশিক বাস্তবায়ন হওয়ায় সেখানে জামায়াত জোট ভালো সাফল্য পায়। রাজধানী ঢাকাও এর মধ্যে পড়ে। এটি হয় মূলত আওয়ামী লীগ বলয়ের ওপর মামলাবাজি ও দখল কার্যক্রমের কারণে স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশ হাইকমান্ডের পরামর্শ না শোনায়। এর বাইরেও আলোচনা রয়েছে। অনধিক ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে ভোট নিষ্পত্তি হয়েছে ৫০টির মতো আসনে। এ ধরনের আসনের ফল পরিবর্তনে একটি ব্যাকরণ ২০০৮ সালে অনুসরণ করা হয়েছিল। সেটি ছিল প্রচারণায় বাধা দেয়া, প্রতিপক্ষ ভোট বলয়ের নারী ভোটারদের উপস্থিত না হতে আতঙ্ক তৈরি করা, যাতায়াতে অসুবিধাজনক স্থানে ভোটের কেন্দ্র ও বুথ স্থাপন, ভোট প্রদান ধীর করে ভোটের হার কমিয়ে দেয়া। সেই সাথে নানা ধরনের অভিযোগ এনে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ধরপাকড় করা। আর গণনাপবের্র হিসাবে নয়-ছয় করা। এবার সেটি হয়েছে কি না বলা মুশকিল। তবে জন ড্যানিলোভিজের মন্তব্যটি বেশ অর্থবোধক। বিজিত পক্ষের মধ্যে শুধু এ সন্দেহ সীমিত নয়, ভোটাধিকার প্রয়োগ করা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মধ্যে এ সন্দেহ স্পষ্ট।
চার.
বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবয়ব কী হতে পারে— এ প্রশ্ন এখন নীতিনির্ধারক, বিশ্লেষক এবং সাধারণ নাগরিক সবার মধ্যে আলোচিত। এবার তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে নতুন সরকার গঠন হতে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে আগের ঘোষণা অনুসারে এই সরকারে বিএনপির সহযোগী দলের কয়েক জন নেতা স্থান পেতে পারেন।
নতুন সরকার গঠনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হবে সংস্কারের বিষয়ে হ্যাঁ ভোট জয়ী হওয়ায় রাষ্ট্র বা সংবিধান সংস্কারের কী রূপ হতে পারে। সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান হ্যাঁ ভোটকে সমর্থন দেয়ার কথা বলেছিলেন। আবার দলের পক্ষ থেকে বহু স্থানে ‘না’ সমর্থন করা হয়েছে। এর ফলে গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলেও ‘না’ এর পক্ষে বিপুল ভোট (৩২ শতাংশ) পড়েছে। এটি ‘না’ এর পক্ষ সমর্থনকারী জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ভোটের ফলের সাথে মোটেই মিলে না। দলটি একটি আসনেও জয় পায়নি। এই বিপুল ভোটে অনেকটা নিশ্চিত বিএনপি সমর্থকদের ভোট রয়েছে।
এ অবস্থায় বলা যায়, সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপি যেসব বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন হতে পারে। উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে নীতিগত সমর্থন থাকায় সেটিও বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে সেটি হতে পারে নারী এমপি নির্বাচনের মতো উচ্চকক্ষের এমপি নির্বাচিত হওয়ার অনুপাত নিয়মে, যেটি সংস্কার প্যাকেজে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্বাচনের কথা বলা হয়। গণভোটে প্যাকেজ হিসাবে হ্যাঁ জয়ী হলেও প্যাকেজে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়া বাকি অংশ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম। নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতারা এটি খোলাসাভাবে বলেছেন।
আমরা জানি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিএনপি ডিজওন করেনি। আবার এটিকে পুরোপুরি ওনও করেনি। যার কারণে এনসিপিকে বিএনপি জোটে নেয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায়নি দলের নেতৃত্ব। এ অবস্থান জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে আওয়ামী লীগ বড় মামলা বা দখলজনিত অবস্থার শিকার হওয়ার পরও বিএনপির সাথে গোপন সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে বাধা হয়নি।
চূড়ান্ত ফলে নতুন সংসদে বিএনপি জোটের আসন সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২১৩ এর মতো। আর জামায়াত জোটের আসন দাঁড়াতে পারে ৭৭/৭৮টি। এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন পরিবর্ধন দৃশ্যত করতে পারবে। জুলাই সনদের প্যাকেজ পুরোপুরি গ্রহণ না করে তা বিএনপি নিজেদের মতো করে বিন্যাস করতে পারে।
অন্তরালে বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের কৌশলগত সমঝোতাকারী মনে করা হয় ভারতীয় গোয়েন্দা লবিকে। এই লবি ভোট বিন্যাসকে পরিবর্তন করতে বড়ভাবে সহযোগিতা করেছে। বলা হয়ে থাকে— বিএনপির ৩৫ ভাগ ভোটের সাথে আওয়ামী লীগের ২০ ভাগ যুক্ত হয়ে একটি অবিশ্বাস্য ফল তৈরি করেছে। সঙ্গতকারণে নতুন সরকারের নীতির ওপরও এর প্রভাব থাকবে। ভারতীয় লবি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলে আসছিল। এর অর্থ ছিল মূলত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা। এ পুনর্বাসনের বিষয়ে মাত্রাগত মতের ব্যবধান থাকলেও নীতিগত পার্থক্য পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য ও ইইউর নেই বলে মনে হয়। হয়তোবা শেখ হাসিনার ছেলেমেয়েদের তারেক রহমানের রাজনীতিতে স্বাগত জানানোর কথার সাথে এর একটি সম্পর্ক থাকতে পারে।
কিন্তু জুলাই বিপ্লবের আগের মতো দিল্লির ইচ্ছায় ঢাকার সিদ্ধান্ত কি অন্যরা মেনে নেবে? আমরা সম্ভবত নতুন সরকার গঠনের ৯ মাস থেকে দুই বছর সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন দেখতে পারি। এটিও অসম্ভব নয় যে আওয়ামী লীগকে পরবর্তী ২০৩০ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেয়া হতে পারে। বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিকভাবে সংহত হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া হতে পারে। সে নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অংশ নিতে পারেন। এটি হতে পারে দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রথম পদক্ষেপ। আর এই শক্তি প্রবল হলে জুলাই বিপ্লবের যেসব তরুণ জীবন আর রক্ত দিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি করেছেন তারা কি পাশে থাকবেন? বাইরের অন্য ক্ষমতাধররা দিল্লির ইচ্ছায় পথচলাকে কি অ্যালাউ করবে?
বাংলাদেশের শাসন অবকাঠামোর গভীরে আগের সরকার ও প্রতিবেশীবান্ধব ব্যক্তিদের অবস্থান রয়েছে। দিল্লি চাইবে তাদের প্রভাব প্রবল হয়ে উঠুক। জনপ্রশাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে এ বলয়ের জনবলের জোরালো অবস্থানের সুযোগ তৈরি হোক। সেটি বাস্তবে ঘটতে থাকলে কী হবে? জন ড্যানিলোভিজের তির্যক মন্তব্যের সাথে এর কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
পাঁচ.
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৮০টির কাছাকাছি আসনে জয়ী হয়ে এবার সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে পারে। এর মধ্যে এনসিপির এমপি থাকবে ছয়জন। বিএনপির সরকার চালাতে বিরোধী বলয়ের সহযোগিতা দরকার। নানা বিবেচনায় নতুন সরকারের সামনে শক্তিমান বিরোধী দল দরকার। জামায়াত সেই ভূমিকা পালনের মতো জয় পেয়েছে। জামায়াত, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নতুন পরিস্থিতিতে শক্তি কতখানি তা এক অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে বোঝা যাবে।
এটি ঠিক যে, জামায়াত সমর্থক বলয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এমন এক হাইপ উঠেছিল যে দলটি এবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুসারে এক বা সোয়া শ’ আসনের আশপাশে দলটির অবস্থান ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। প্রতিবেশী দেশ যেকোনোভাবে জামায়াতের সরকার চাইবে না, সেটি কারো কাছে অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। এ কারণে নির্বাচনপূর্ব মেরুকরণে মধ্যস্থতার মতো যা কিছু দেশটির পক্ষ থেকে হয়েছে সেটি ছিল স্বাভাবিক।
যারা প্রাকনির্বাচন অন্তর্নিহিত কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ ও মেরুকরণের খবর রাখতেন তারা জানতেন যে, নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্তভাবে কী হতে যাচ্ছে। জামায়াতের নীতিপ্রণেতারা গভীরভাবে পরিস্থিতি দেখলে বুঝতে পারবেন, যে ফল দলটি এবার পেয়েছে; তা কম মনে হলেও ইতিহাসে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ ধরনের একটি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। যদিও এতে লেখা হয়েছিল ‘জামায়াত জয়ী হোক বা না হোক’।
এখন জামায়াত ২০৩০ সালের দিকে দৃষ্টি দিতে পারে। সে নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগ নেপথ্য সমঝোতার সুযোগ থাকবে না। জামায়াত চাইলে আগামী পাঁচ বছর গঠনমূলক দূরদর্শী অবস্থান নিয়ে পরের নির্বাচনকে টার্গেট করতে পারে। সেটি হবে জামায়াতের জন্য বড় অর্জন। এবারের নির্বাচনে জামায়াত যেখানে গেছে সেটি হতে পারে তার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি। কিন্তু বিএনপি সে পরিবেশ রাখতে চাইবে কি না অথবা সেটি তাদের পরামর্শদাতারা রাখতে দেবেন কি না তা-ই বড় প্রশ্ন। প্রশ্নটি জন ড্যানিলোভিজেরও রয়েছে বলে তার তির্যক মন্তব্যে মনে হয়।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
ই-মেইল : [email protected]



