টি এস এলিয়ট ও বিবেকহীন সভ্যতা

‘টি এস এলিয়ট শুধু একজন কবি নন; তিনি আধুনিক সভ্যতার এক গভীর বিশ্লেষক। তার কবিতা আমাদের শুধু সৌন্দর্য দেয় না; বরং আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়- আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমাদের অগ্রগতি কি সত্যিই মানবিক উন্নয়ন, নাকি এটি এক বিবেকহীন যাত্রা? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই এলিয়টের প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট।’

মীযানুল করীম
মীযানুল করীম |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের ছাড়া আধুনিকতার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। টি এস এলিয়ট তেমনি এক অনিবার্য নাম। পূর্ণ নাম থমাস স্টার্নস এলিয়ট, ১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে জন্ম, আর ১৯৬৫ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনে তার মৃত্যু। তার মৃত্যুসংবাদ প্রথম রেডিওতে শোনার স্মৃতি অনেকের মতোই আমার মনেও একধরনের কৌতূহল জাগিয়েছিল। কারণ তখন সাহিত্যের পরিচিত আকাশ ভরাট ছিল উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, রবার্ট ব্রাউনিং কিংবা জন কিটসের মতো রোমান্টিক কবিদের দ্বারা। সেই ভিড়ে এলিয়ট যেন অন্য এক জগতের প্রতিনিধি- সংযমী, জটিল; কিন্তু গভীরভাবে আধুনিক। এলিয়টের আধুনিকতা ছিল চমকপ্রদ এক বৈপরীত্যে ভরা। তিনি ব্যক্তিগতভাবে রক্ষণশীল; কিন্তু সাহিত্যিকভাবে বিপ্লবী। তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার অগ্রগতিকে অস্বীকার করেননি, তবে তার অন্তঃসারশূন্যতা ও নৈতিক অবক্ষয়কে নির্মমভাবে উন্মোচন করেছেন। তার লেখায় বারবার ফিরে আসে এক ‘বিবেকহীন সভ্যতা’- যেখানে মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও আত্মিকভাবে শূন্য, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং নৈতিকভাবে বিভ্রান্ত।

এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে তার ব্যক্তিগত জীবন ও বৌদ্ধিক যাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে শিক্ষালাভ তাকে বহুমাত্রিক চিন্তার জগতে প্রবেশ করায়। ফরাসি ও জার্মান সাহিত্যের সাথে পরিচয় তার কাব্যে বহুভাষিকতা ও প্রতীকী গভীরতা এনে দেয়। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি এবং পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ ও অ্যাংলিকান ধর্মে দীক্ষা- এসব ঘটনা তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক রূপান্তরের সূচক।

এলিয়টের সাহিত্যজীবনের সূচনা ঘটে তার বিখ্যাত কবিতা ‘The Love Song of J. Alfred Prufrock’ (১৯১৫) দিয়ে। এখানে আধুনিক মানুষের আত্মসঙ্কট, দ্বিধা, বিচ্ছিন্নতা এমনভাবে উঠে এসেছে, যা এক নতুন কাব্যভাষার সূচনা করে। কিন্তু তার প্রকৃত খ্যাতি আসে ‘The Waste Land’ (১৯২২)-এর মাধ্যমে। এই কাব্যগ্রন্থ আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের এক মাইলফলক, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের মানসিক ভাঙন, সাংস্কৃতিক শূন্যতা এবং নৈতিক অবক্ষয় এক জটিল প্রতীকের জালে বন্দী।

‘The Waste Land’-এ এলিয়ট যে সভ্যতার চিত্র আঁকেন, তা কেবল ইউরোপের নয়- এটি এক সর্বজনীন সঙ্কটের প্রতিফলন। এখানে মানুষ তার শেকড় হারিয়েছে, ধর্মীয় বিশ্বাস ভেঙে পড়েছে, আর ভোগবাদ ও যান্ত্রিকতা মানুষের আত্মাকে শুষে নিচ্ছে। এই চিত্র আজকের বিশ্বেও প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি, ভোগবাদ, গ্লোবালাইজেশন- সব কিছু মিলিয়ে আমরা এক নতুন ধরনের ‘বর্জ্যভূমি’তে বসবাস করছি, যেখানে উন্নয়ন আছে; কিন্তু শান্তি নেই; যোগাযোগ আছে; কিন্তু সম্পর্ক নেই।

এলিয়টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্য ‘The Hollow Men’ (১৯২৫), যেখানে তিনি এক শূন্য মানবতার প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন- ‘We are the hollow men’-এ ঘোষণা যেন আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্কটকে নগ্ন করে দেয়। একইভাবে ‘Four Quartet’-এ সময়, মৃত্যু, আধ্যাত্মিকতা ও চিরন্তন সত্যের অনুসন্ধান তাকে এক দার্শনিক কবির আসনে বসিয়েছে।

কবিতার বাইরে এলিয়ট নাট্যকার ও সমালোচক হিসেবেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার নাটক ‘Murder in the Cathedral’ ধর্মীয় ও নৈতিক দ্বন্দ্বের গভীর অনুসন্ধান। আর তার প্রবন্ধ ‘Tradition and the Individual Talent’ সাহিত্য সমালোচনার এক মৌলিক তত্ত্ব উপস্থাপন করে- একজন কবিকে বোঝার জন্য তাকে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দেখতে হবে। তার ‘objective correlative’ ধারণা কবিতায় আবেগ প্রকাশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

১৯৪৮ সালে এলিয়ট সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, যা তার সাহিত্যিক অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে তার গুরুত্ব কেবল পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়- তিনি আধুনিক মানুষের মানসিক ও নৈতিক সঙ্কটের এক অনন্য ভাষ্যকার।

বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে ফররুখ আহমদের সাথে এলিয়টের একটি তুলনা টানা যায়। ফররুখ যেমন বৈশাখের প্রলয়ঙ্কর রূপ দিয়ে এক আধ্যাত্মিক সত্যের ইঙ্গিত দেন, তেমনি এলিয়ট ‘April is the cruelest month’ বলে আধুনিকতার নির্মমতাকে তুলে ধরেন। তবে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্যও আছে- ফররুখের কাব্যে ধর্মীয় আস্থা দৃঢ়, আর এলিয়টের কাব্যে সেই আস্থার পুনঃঅনুসন্ধান।

এলিয়টের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো- তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্তর্গত সঙ্কটকে ভেতর থেকে দেখেছেন। তিনি আমেরিকান হয়েও আমেরিকার ভোগবাদী সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ব্রিটিশ সমাজে থেকেও তার সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেছেন। আজকের বিশ্বে, যেখানে আমেরিকান স্বপ্ন এখনো বহু মানুষের আকাক্সক্ষার কেন্দ্র, সেখানে এলিয়টের এ অবস্থান একধরনের বৌদ্ধিক সততা নির্দেশ করে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এলিয়টের ভাবনা প্রাসঙ্গিক। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে, অবকাঠামো গড়ে উঠছে, অর্থনীতি বাড়ছে- কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উন্নয়নের সাথে কি নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও মানবিকতা সমানতালে এগোচ্ছে? আমরা কি এক নতুন ধরনের ‘বিবেকহীন সভ্যতা’র দিকে এগিয়ে যাচ্ছি না?

এলিয়ট আমাদের শেখান- সভ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং তার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থানে। যদি সেই ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে উন্নয়ন কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য হয়ে থাকে। সব শেষে বলা যায়, টি এস এলিয়ট শুধু একজন কবি নন; তিনি আধুনিক সভ্যতার এক গভীর বিশ্লেষক। তার কবিতা আমাদের শুধু সৌন্দর্য দেয় না; বরং আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়- আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমাদের অগ্রগতি কি সত্যিই মানবিক উন্নয়ন, নাকি এটি এক বিবেকহীন যাত্রা? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই এলিয়টের প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক