নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এক মাসও হয়নি। সময়টা অল্প। কিন্তু প্রশ্ন অনেক। উদ্বেগ আরো বেশি। ২৪ জুলাইয়ের বিপ্লব কোনো ক্ষমতার হাতবদল ছিল না। এটি ছিল একটি প্রত্যাখ্যান। পুরনো রাজনীতি, পুরনো সংস্কৃতি, পুরনো ভয়— সব কিছুর বিরুদ্ধে জনতার স্পষ্ট ‘না’। সেই ‘না’-এর ভেতরেই ছিল নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন। জবাবদিহিমূলক সরকার। আইনের শাসন। নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। নাগরিকের নিরাপত্তা। এখনই যদি মানুষ প্রশ্ন তোলে- ‘দেশটা কি আবার সেই পুরনো পথেই যাচ্ছে?’ তা হলে তা হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।
জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত হলো, ব্যাখ্যা। ক্ষমতা মানে ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নয়। ক্ষমতা মানে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের ঘটনা এখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে বৈধতার ওপর। সেই বৈধতা আসে নিয়ম, প্রক্রিয়া ও যুক্তি থেকে। গভর্নরের বিদায়ের ঘটনায় তিনটি প্রশ্ন এক সাথে উঠে আসে, কেন ও কীভাবে অপসারণ, আর এর অর্থ কী।
কেন’র স্পষ্ট উত্তর নেই। কীভাবে— তা ছিল তড়িঘড়ি, অমার্জিত এবং চাপের মুখে নেয়া সিদ্ধান্তের মতো। আর অর্থ— এই সঙ্কটময় অর্থনৈতিক সময়ে বার্তা যায় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে নয়। এটি শুধু ব্যক্তির অপসারণ নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্র। খেলাপি ঋণ, রিজার্ভ সঙ্কট, পুঁজি পাচার— সব কিছুর কেন্দ্রে এই প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসপ্রায়। জুলাই বিপ্লব ছিল এই ধ্বংসের বিরুদ্ধেই। অর্থমন্ত্রী যখন বলেন, ‘অনেক জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে’— তখন প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ ব্যাংককেও কি সেই ‘অনেক জায়গা’র একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ক্ষমতার বিভাজনের কথা বলেন, কারণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে তা স্বৈরতন্ত্রের রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বিলাসিতা নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
নতুন গভর্নরের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। প্রশ্নটি কাঠামোগত। এই পদে বসার জন্য যে নিরপেক্ষতা, যে দূরত্ব, যে নৈতিক উচ্চতা প্রয়োজন— তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে? নিজের ঋণ পুনঃতফসিল করা একজন ব্যক্তি খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর হতে পারবেন— এই প্রশ্ন যৌক্তিক। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একজন ব্যক্তি চাপমুক্তভাবে কাজ করতে পারবেন কি না এমন সংশয়ও অমূলক নয়। এখানেই আসে চব্বিশের জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা। মানুষ চেয়েছিল প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হোক, ব্যক্তি নয়।
আরো বড় প্রশ্ন আসছে মাঠের বাস্তবতা থেকে। রংপুরে যুবদল নেতাদের নামে চাঁদাবাজি, দখলচেষ্টা, গুলি করার হুমকি। নারায়ণগঞ্জে কারখানায় প্রকাশ্যে লুটপাট। পুলিশ সময় মতো পৌঁছায় না। মামলা দিতে গেলে রাজনৈতিক নাম বাদ দেয়ার চাপ। গ্রেফতার হয়, ছেড়ে দেয়া হয়। এই দৃশ্যগুলো খুব চেনা। এখানে সমস্যা শুধু রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার নয়। সমস্যা রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়। দ্রুত, দৃঢ়, নিরপেক্ষ ব্যবস্থা কোথায়?
কিছু ক্ষেত্রে সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছে। প্রশ্ন হলো, আইন কোথায়? দলীয় শাস্তি আইনের বিকল্প হতে পারে কি? অপরাধের বিচার তো হবে রাষ্ট্রের আইনে।
রাষ্ট্রের বৈধতা আসে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষমতা থেকে। যদি নাগরিক মনে করে, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় থাকলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা যায়— তা হলে রাষ্ট্র ব্যর্থ। উদ্বেগ এখানেই।
নরসিংদীর মাধবদীতে যা ঘটেছে, তা নিছক হত্যা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দলিল। একজন কিশোরী। বাবার চোখের সামনে অপহরণ। ধর্ষণ। এর পর হত্যা। লাশ পড়ে থাকে ফসলি জমিতে। এই দৃশ্য সভ্য রাষ্ট্রে বেমানান। এই হত্যাকাণ্ড হঠাৎ ঘটেনি। এটি পরিকল্পিত। ধারাবাহিক এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর— এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের ফল।
প্রশ্ন হলো, নরসিংদীতে ক্ষমতা কার হাতে ছিল? পুলিশের হাতে? নাকি স্থানীয় মাস্তান, সালিসকারী ও দলীয় নেতাদের হাতে?
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো তথাকথিত ‘সালিস’। ধর্ষণের বিচার সালিসে হয় না। ধর্ষণ আপসের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীরা ‘মীমাংসা’র নামে অপরাধ ধামাচাপা দিতে চেয়েছে। অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিচার হয়নি। ফলে অপরাধীরা আরো সাহসী হয়েছে। কিশোরীকে হত্যা করা হয়েছে কারণ সে ন্যায়বিচার চেয়েছিল। এটি ন্যায়বিচারের ওপর আঘাত।
আরেকটি ভয়াবহ প্রশ্ন উঠছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। পুলিশের বক্তব্য-পরিবার আগে থানায় অভিযোগ করেনি। এই কথা শুনে প্রশ্ন জাগে, কেন করেনি? কারণ তারা ভয় পেয়েছিল। স্থানীয় নেতারা হুমকি দিয়েছিল। তারা জানত— থানায় গেলেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই।
এখানে পুলিশ পরে তৎপর হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন অনেক দেরিতে। ধর্ষণের পরই যদি মামলা হতো। যদি সালিসের নামে অপরাধ আড়াল করতে না দেয়া হতো। যদি হুমকির সময়ই রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াতো— তা হলে কি এই কিশোরী বেঁচে থাকতে পারত না?
উদ্বেগের বিষয় হলো— সালিসে একজন স্থানীয় বিএনপি নেতার নেতৃত্বের অভিযোগ। চব্বিশে জুলাইয়ের বিপ্লব কি দলীয় অপরাধের বিরুদ্ধে ছিল না? দলীয় পরিচয় থাকলে অপরাধ মাফ— এই সংস্কৃতি কি চলতেই থাকবে? নরসিংদীর ঘটনায় আইন সমান ছিল না। শক্তিশালীরা সালিস বসিয়েছে। দুর্বলরা শিকারে পরিণত হয়েছে।
সরকার বদলেছে। কিন্তু আচরণ বদলায়নি। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক সঙ্কেত। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সদ্য বিদায়ী উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান খানকে যেভাবে হয়রানি করা হয়েছে, তা নতুন কিছু নয়। এটি পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। পার্থক্য শুধু একটাই— এখন ক্ষমতায় অন্যরা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনের সময় এ ধরনের ঘটনা ছিল নিয়মিত। তখন বলা হতো, ‘নিরাপত্তা যাচাই।’ আজো একই ভাষা। একই আচরণ। একই দম্ভ।
নেপালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে যেতে গিয়ে আদিলুর রহমান খানকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। পরিচয় জানার পরও ছাড় দেয়া হয়নি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ। সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা— রাষ্ট্র এখনো সন্দেহের চোখে নাগরিককে দেখে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র চলে নিয়মে, খেয়ালে নয়। কিন্তু এখানে যা ঘটেছে, তা খেয়ালনির্ভর ক্ষমতার প্রদর্শন। আইন দেখানো হয়নি। কারণ দেখানো হয়নি। শুধু বসিয়ে রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘ঘটনা তেমন কিছু নয়।’ এটাই সমস্যার মূল। রাষ্ট্র যখন হয়রানিকে তুচ্ছ করে, তখন নাগরিকের অধিকার তুচ্ছ হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, কর্তৃত্ববাদী সরকার গড়ে ওঠে দৈনন্দিন ছোট ছোট অন্যায়ের মাধ্যমে। বিমানবন্দরে হয়রানি সেই ছোট অন্যায়গুলোর একটি। কিন্তু এর প্রভাব বড়। নতুন সরকার যদি সত্যিই পুরনো পথ ছাড়তে চায়, তবে শুরুটা এখান থেকেই করতে হবে। বিমানবন্দর নাগরিকের ভয়ের জায়গা হতে পারে না। নিরাপত্তা আর হয়রানি এক জিনিস নয়। রাষ্ট্র যদি সন্দেহ দিয়ে শুরু করে, বিশ্বাস দিয়ে শেষ করতে পারে না। আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— আমরা কি নতুন রাষ্ট্র গড়ছি, নাকি পুরনো ব্যবস্থার নতুন পাহারাদার হচ্ছি?
এই কয়দিনে সরকার যা করছে, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো— সরকার কী বার্তা দিচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক নিয়োগের বার্তা। মাঠে দলীয় দাপটের বিরুদ্ধে নীরবতার বার্তা। গুরুতর অভিযোগের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়ার বার্তা। এই বার্তাগুলো বিপজ্জনক।
এখন কী করা জরুরি? প্রথমত, বড় সিদ্ধান্তে পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে দলীয় অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে— শুধু বিবৃতিতে নয়, বাস্তবে। চতুর্থত, পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাই সনদ কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। এটি একটি সামাজিক চুক্তি। জনগণ বলেছে, আমরা ক্ষমতা দিলাম, কিন্তু শর্তসহ। সেই শর্ত হলো জবাবদিহি, আইনের শাসন, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ। এই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সরকার কেবল রাজনৈতিক বৈধতাই হারাবে না, নৈতিক বৈধতাও হারাবে। ২৪ জুলাই মানুষ কোনো অলৌকিক পরিবর্তন আশা করেনি। মানুষ আশা করেছিল দিক পরিবর্তন। সেই দিক যদি ভুল হয়, তা হলে এখনই সংশোধন জরুরি। কারণ ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করে না। জনগণও করে না।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



