খালেদা জিয়া ছিলেন রাজনীতির অভিভাবক

অনেকে বলেছেন, এই বিদায়ে রাজনীতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হলো, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বর্তমান সময়ের মেরুকৃত ও উত্তপ্ত রাজনীতিতে এমন অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের প্রয়োজন আরো বেশি ছিল এই আফসোসও উচ্চারিত হয়েছে বারবার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম কেবল ক্ষমতার স্মৃতি নয়, বরং একটি সময়, একটি সংগ্রাম ও একটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। খালেদা জিয়া সেই বিরল নামগুলোর একটি। তিনি শুধু তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের প্রতীক। সামরিক শাসনের ছায়া পেরিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতা, বিরোধিতা, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন গভীরভাবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি হারাল তার অন্যতম প্রভাবশালী অভিভাবককে। তার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রস্থান নয়, এটি এক যুগের বিদায়, এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান, যেখানে নেতৃত্ব মানেই ছিল দৃঢ়তা, প্রতিরোধ এবং আপসহীন অবস্থান।

একটি হঠাৎ বদলে যাওয়া জীবন

খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেননি স্বপ্ন নিয়ে। তিনি রাজনীতিতে আসতে প্রস্তুত ছিলেন না। রাজনীতি তার প্রথম পছন্দ ছিল না; বরং রাজনীতি তাকে ডেকে নিয়েছিল নির্মম বাস্তবতায়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে, চট্টগ্রামে গুলির শব্দে বদলে যায় তার জীবনের সব কিছু। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। তখন খালেদা জিয়ার জীবনও ভেঙে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে। তিনি হয়ে পড়েন একজন বিধবা, দুই সন্তানের মা, আর একটি দলের জন্য ‘শেষ আশ্রয়’।

সে দিন থেকে খালেদা জিয়ার জীবনে আর স্বাভাবিকতা ফেরেনি। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন রাজনীতির কঠিন মঞ্চে। কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি নামেন এমন এক লড়াইয়ে, যেখানে ভুলের সুযোগ নেই, দুর্বলতার মূল্য ভয়াবহ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তখন নেতৃত্বশূন্য। দলের ভেতর-বাইরে অনিশ্চয়তা, সামরিক শাসনের চাপ আর রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এই কঠিন সময়ে খালেদা জিয়াকে সামনে আনা হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো প্রতীকী নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রমাণ হয়- এই নীরব গৃহবধূর ভেতর লুকিয়ে আছে দৃঢ়তা, ধৈর্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন এক নেত্রী। রাজপথে তার উপস্থিতি, কারাবরণ, গৃহবন্দী সব কিছুই তাকে ধীরে ধীরে পরিণত করে জনতার নেত্রীত্বে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী অবস্থান

আশির দশকের মধ্যভাগে যখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল দেশ, তখন রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারী ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন আন্দোলনের মুখ। তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু দৃঢ়। তার উপস্থিতিই হাজারো নেতাকর্মীর সাহস হয়ে উঠত। কারাবরণ, অবরোধ, হুমকি, কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। অনেকেই তখন তাকে দেখেছেন কালো শাড়িতে, চোখে গভীর দৃঢ়তা, মুখে সংযত নীরবতা। সেই নীরবতাই ছিল তার শক্তি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে।

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত স্বীকৃতি পায়। সেই আন্দোলনে তার ভূমিকা তাকে এনে দেয় ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নেত্রীর মর্যাদা।

সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন, এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। এ কারণে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছে তিনি শুধু বিএনপির নেত্রী নন, আধুনিক বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম রূপকার।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম অধ্যায় : গণতন্ত্রের পুনরাগমন

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের প্রসার- এই সময়ের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার সংসদকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসে। খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন- ১৯৯১, ১৯৯৬ (স্বল্পমেয়াদি) ও ২০০১-০৬ মেয়াদে। তবে প্রথম মেয়াদেই শুরু হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›িদ্বতার তীব্রতা। সংসদ বর্জন, হরতাল, আন্দোলন- এসব রাজনীতির নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তবুও খালেদা জিয়া তখনো আপসহীন অবস্থান ধরে রাখেন। ১৯৯৬ সালের আন্দোলনের মুখে তার সরকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। কিন্তু পাঁচ বছর পর, ২০০১ সালে তিনি আবারো ক্ষমতায় ফেরেন- এবার আরো শক্ত অবস্থানে। ২০০১-০৬ তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া। তার শাসনামলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অতুলনীয় অগ্রগতি হয়েছে।

ওয়ান-ইলেভেন ও রাজনৈতিক বিপর্যয়

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভয়াল অধ্যায়। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। তথাকথিত দুর্নীতির মামলায় কারাবরণ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা সব মিলিয়ে তিনি কার্যত রাজনীতির বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন।

এ সময়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘অভিভাবকহীনতা’ কতটা গভীর সঙ্কট তৈরি করতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বহীনতায় পড়ে, দল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। অনেকেই তখন বলেছিলেন, খালেদা জিয়া শুধু দলের চেয়ারপারসন নন, তিনি দলের ছায়া, আশ্রয় ও অভিভাবক।

কারাগার, অসুস্থতা ও নীরব সংগ্রাম

২০১৮ সালে পতিত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার রোষানলে পড়ে কারাগারে যান খালেদা জিয়া। বয়স, শারীরিক অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাব তার জীবনকে করে তোলে সঙ্কটাপন্ন। দীর্ঘদিন গৃহবন্দী অবস্থায় থাকার পর চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি না পাওয়া নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয় মানবিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক।

এ সময় তার কণ্ঠ প্রায় নীরব। কোনো সমাবেশে বক্তৃতা নেই, রাজপথে সরাসরি উপস্থিতি নেই। কিন্তু তার নীরবতাই যেন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা হয়ে ওঠে। দল ও অনুসারীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন এক জীবন্ত স্মৃতি, এক প্রতীক্ষার প্রতীক।

রাজনীতির অভিভাবক কেন

খালেদা জিয়াকে ‘রাজনীতির অভিভাবক’ বলা হয় কেবল বয়স বা অভিজ্ঞতার কারণে নয়। রাজনৈতিক শালীনতা, বক্তব্যে সংযম এবং সিদ্ধান্তে দূরদর্শিতা এই তিন গুণই তাকে আলাদা করে তুলেছিল। তরুণ রাজনীতিকদের কাছে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতা তার রাজনীতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

অনেক সঙ্কটময় মুহূর্তে তিনি ছিলেন পরামর্শের শেষ ঠিকানা। ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচন, আন্দোলন কিংবা সহিংস পরিস্থিতিতে তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন শান্তি, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা। রাজনীতিকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার না বানিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার আহ্বানই ছিল তার রাজনীতির মূল সুর।

দলীয় সঙ্কটে, বিভক্তির সময়ে, আপস ও প্রতিরোধের প্রশ্নে তার সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। তিনি ছিলেন এমন এক নেত্রী, যার দিকে তাকিয়ে দল দিকনির্দেশনা পেতো।

মা হিসেবে খালেদা জিয়া

রাজনীতির বাইরে খালেদা জিয়া ছিলেন এক নিঃসঙ্গ মানুষ, স্বামী নিহত, দুই ছেলের একজন মৃত, অন্যজন প্রবাসে নির্বাসিত। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন শোক ও বিচ্ছেদের ভার বহনকারী একজন মা।

তার হাসি ছিল সংযত, কথাবার্তা ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন দৃঢ়। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘ম্যাডাম’, প্রতিপক্ষের কাছে ‘অদম্য প্রতিদ্ব›দ্বী’। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের রোষানালে এক সন্তানের সহিংস মৃত্যু, আরেক সন্তানের প্রবাসে বিচ্ছিন্ন জীবন এই শোক তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি কখনো প্রকাশ্যে কাঁদেননি। তার কান্না ছিল নীরব, গভীর, একান্ত। অনেকেই বলেন, জীবনের শেষ দিকে তিনি রাজনীতি নয়, স্মৃতি নিয়েই বেঁচে ছিলেন।

একটি দল, একটি শূন্যতার নাম

বিএনপি তার নেতৃত্বে যেমন শক্তিশালী হয়েছিল, তেমনি তার অনুপস্থিতিতে হয়ে পড়ে দিশাহীন।

তিনি ছিলেন দলের মুখ, মনোবল আর শেষ ভরসা। নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু চেয়ারপারসন নন, তিনি ছিলেন আশ্রয়, ভরসা, প্রতীক। তার মৃত্যুতে বিএনপি হারাল শুধু একজন চেয়ারপারসন নয়, হারাল তার ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীককে। এই বিদায় বিএনপির সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে- দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কতটা সুসংহত হবে? রাজনৈতিক ঐতিহ্য কিভাবে রক্ষা হবে? অভিভাবকহীন রাজনীতিতে দল কিভাবে টিকে থাকবে?

ইতিহাসের এক মানবিক চরিত্র

খালেদা জিয়াকে ইতিহাস বিচার করবে একজন মানবিক নেত্রী হিসেবে। তার শাসনামলে যেমন উন্নয়ন হয়েছে, তেমনি হয়েছে রাষ্ট্র পুনর্গঠন। স্বৈরাচার এরশাদের তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে দেশকে একটি স্বনির্ভর দেশে রূপান্তর করেছিলেন। তিনি ছিলেন যেমন গণতন্ত্রের প্রতীক, তেমনি অন্যায়, অন্যায্যের বিরুদ্ধে আপসহীন। ইতিহাস কখনো মানুষকে একমাত্রিকভাবে দেখে না। খালেদা জিয়া ছিলেন, মানবিক, দৃঢ় একসাথে সব।

উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন

প্রশ্ন উঠছে এই অভিভাবকশূন্য রাজনীতিতে কে নেবে সেই দায়িত্ব? নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকরা কি তার আদর্শ ও মূল্যবোধ ধারণ করতে পারবেন? বিশ্লেষকরা মনে করেন, তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংলাপ, সহনশীলতা, নৈতিকতা ও সাংবিধানিক চর্চার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, সেটিকে ধারণ করাই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

শেষ কথা

রাজনীতির অভিভাবকের বিদায় আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে দিয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি দায়িত্ব, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার নামও। তার প্রস্থান একটি যুগের অবসান হলেও তার আদর্শ এখনো প্রাসঙ্গিক। তার বিদায়ের খবরে রাজনীতির অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র উঠে এসেছে তার অবদানের কথা।

অনেকে বলেছেন, এই বিদায়ে রাজনীতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হলো, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বর্তমান সময়ের মেরুকৃত ও উত্তপ্ত রাজনীতিতে এমন অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের প্রয়োজন আরো বেশি ছিল এই আফসোসও উচ্চারিত হয়েছে বারবার।