নেপালে নতুন সংসদ নির্বাচনে ভোট হয়ে গেল ৫ মার্চ। যুব নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি প্রায় তিন কোটি মানুষের হিমালয়ঘেরা দেশটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এখন তার সরে দাঁড়াবার পালা। বাংলাদেশে ৫ আগস্ট ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সাথে নেপালের জেন-জি বিপ্লবের মিল আছে। ফলে বাংলাদেশেও নিকট প্রতিবেশী নেপালের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল।
নির্বাচনী ফল আজ ৯ মার্চ ঘোষণা হতে পারে। জনমত জরিপে আভাস দেয়া হয়েছিল, পুরনো নেতৃত্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে নেপালে। এপি বলেছে, নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তিন ধারার তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ বালেন। ২০২২ সালে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়ে বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা ও রাস্তা প্রশস্তকরণে সাহসী ভূমিকা রেখে জনসমর্থন পান তিনি। নেপালের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল ‘নেপালি কংগ্রেসের’ নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন গগন থাপা। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর দায়ে অভিযুক্ত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ শর্মা ওলি আবারো ক্ষমতার মসনদে ফিরতে মরিয়া ছিলেন। তিনি জয়ের আশাও করছিলেন।
এ নির্বাচনে বিজয়ী ব্যক্তি হবেন গত দুই দশকের কম সময়ে নেপালের ১৬তম প্রধানমন্ত্রী। বার্তা সংস্থাগুলোর খবর, নেপালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ভোট গণনায় র্যাপার থেকে রাজনৈতিক নেতা বালেন্দ্র শাহর দল বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছে।
গত বছর জেন-জি প্রজন্মের প্রবল আন্দোলনে কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি দেশজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়। বালেন্দ্র কাঠমান্ডু নগরের সাবেক মেয়র ছিলেন। হিমালয়ান টাইমসের সর্বশেষ তথ্য, ১৬৫ আসনের মধ্যে ১৩৫ ফল অনুযায়ী— বালেন্দ্র শাহর দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ ৯৬টি আসনে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির দল ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল’ (ইউএমএল) ১০ আসনে, গগন থাপার নেতৃত্বাধীন নেপালের প্রাচীনতম দল ‘নেপালি কংগ্রেস’ ১১টি আসনে এবং আরেক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহল প্রচণ্ডের দল এগিয়ে সাতটি আসনে এগিয়ে ছিল।
নেপালের সংসদের নিম্নকক্ষের মোট ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৬৫টিতে সরাসরি নির্বাচন হচ্ছে। এখন সেগুলোর গণনা চলছে। সংসদের বাকি ১১০ আসন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্ধারিত হবে। সে ক্ষেত্রে কিছু সময় লাগতে পারে। জেন-জি বিক্ষোভের সাড়ে ছয় মাস পর অনুষ্ঠিত নেপালের এই নির্বাচনে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে ৫৮ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট পড়েছে।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট : চীন ও ভারতের মধ্যে অবস্থিত ৩ কোটি মানুষের এ দেশে কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। ফলে দেশটির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেকারত্ব বেড়েছে, যার মূলে রয়েছে কাঠামোগত সমস্যা ও ব্যাপক দুর্নীতি। দীর্ঘদিনের এ পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গত সেপ্টেম্বরে। রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার তরুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার জেরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। নেপালে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ছিল বামপন্থী কমিউনিস্টদের বড় আন্দোলন ও সংগ্রাম। সে পথ পার হয়ে ২০১৫ সালের সংবিধানে একটি মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করা হয়। নেপালের দু’টি সংসদ কক্ষের মধ্যে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ।
প্রথম পদ্ধতিটি ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি) নামে পরিচিত, যার অর্থ যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে সে আসনটি জিতবে। দ্বিতীয়টি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নামে পরিচিত, যা একটি রাজনৈতিক দলের ভোটের অনুপাত বিবেচনা করে। পার্লামেন্টের ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৬৫টি আসন এফপিটিপি পদ্ধতিতে পূরণ করা হয়, বাকি ১১০টি আসন পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচিত হন। উভয় পদ্ধতির ধারণা ছিল সমাজজুড়ে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এ পদ্ধতিতে একটি দলের সরাসরি জয়লাভ করা কঠিন, তাই নির্বাচনে যে কেউ শীর্ষে আসবে তাকে সম্ভবত একটি জোট সরকার পরিচালনা করতে হয়। এভাবে চলে আসছে নেপালে নির্বাচন ব্যবস্থা। ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনে প্রয়োজন ১৩৮ আসন। ২০২২ সালের নির্বাচনের জোট সরকার করে দেশ শাসন করেছে তিনটি সরকার।
নির্বাচনে মূল আলোচ্য কী ছিল
সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভে ৭৭ জন বিক্ষোভকারী মারা যান; যাদের মধ্যে অনেকে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। জনতা সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সচিবালয়সহ অনেক ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল কিন্তু দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে তা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ৫ মার্চের ভোটে এগুলোই প্রধান বিষয় ছিল।
প্রচার অভিযানে পরিবর্তন আসে। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ইশতেহারে উন্নত শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং কর্মসংস্থান হ্রাসের মতো বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে জোর দেয়, যা পূর্ববর্তী সরকারের পতনের দিকে পরিচালিত হতাশার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নেপালি কংগ্রেস ১৯৯০ সাল থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের উচ্চ-স্তরের তদন্তের প্রস্তাব করেছিল।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব : এ নির্বাচনে ভূরাজনৈতিক প্রভাবও ছিল। নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিবেশী ভারতের বড় ভূমিকা রয়েছে। দিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সাথে দিল্লির সম্পর্ক ছিল নড়বড়ে। এর কারণ হলো, ভারত অলিকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখে, যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। অন্যদিকে নেপালে চীনেরও বড় প্রভাব আছে। বেইজিং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ চীন আশা করে, ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার দেশটির বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভসহ (বিআরআই) চীনা স্বার্থের প্রতি সমর্থন জানাবে। যুক্তরাষ্ট্রও এই নির্বাচনে ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘদিন ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রবীণ নেতাদের প্রাধান্য ছিল। তাদের অনেকে ২০০৬ সালে শেষ হওয়া ১০ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় মাওবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এখনো কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) নেতৃত্বে আছেন। আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহল প্রচণ্ড বিভিন্ন কমিউনিস্ট গোষ্ঠীকে একত্র করে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশের প্রাচীনতম দল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে আছেন ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপা।
আরেক আলোচিত প্রার্থী কুলমান ঘিসিং বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় ভূমিকার জন্য পরিচিত। সেপ্টেম্বরের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের অন্যতম সুদান গুরুং।
আরএসপির বিজয়ে নেপালে সরকার গঠনে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। জোট সরকার গঠিত হলে হয়তো সহসা রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসন নাও হতে পারে। এসব জানতে নির্বাচনের ফল প্রকাশ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক : কপি এডিটর, নয়া দিগন্ত



