বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে চাঁদাবাজি। পররাষ্ট্রনীতি ব্যাপক চ্যলেঞ্জের মুখে পড়ার কিছু কারণ রয়েছে। নতুন সরকারের সামনে এ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আসবে।
চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা, স্থানীয় ক্ষমতার বলয় এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ— এই তিনটির সমন্বয়ে চাঁদাবাজি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। চাঁদাবাজির প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং একটি কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কট।
যখন ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিছু ব্যক্তি বা সংগঠন অর্থ আদায় করে, তখন চাঁদাবাজি একটি ‘অঘোষিত রাজনৈতিক অর্থায়ন’ ব্যবস্থায় পরিণত হয়। এর ফলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেকসময় নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে এবং সুশাসনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে যদি স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট গঠন ও কমিশনভিত্তিক অর্থ আদায়ের প্রবণতা তৈরি হয়। ই-টেন্ডারিং ও ডিজিটাল নজরদারির অভাব এই সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। ফলস্বরূপ উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং প্রকল্পের মান কমে যায়।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পেশাদারিত্বের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও তদন্তের দুর্বলতা চাঁদাবাজদের সাহস জোগায়। দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তির অভাবে অপরাধীরা পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার বেড়ে যায়। তদারকি ও সামাজিক নজরদারির অভাব চাঁদাবাজিকে ভিত্তি দেয়। উল্লিখিত কারণগুলো একে-অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে চাঁদাবাজি নির্মূল করা কঠিন।
চাঁদাবাজির সম্ভাব্য প্রভাবগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। চাঁদাবাজি ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করে। দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যখন অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান বা নিরাপত্তাঝুঁকির সম্মুখীন হন, তখন তারা বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। এর ফলে কর্মসংস্থান কমে যায়, শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।
চাঁদাবাজি প্রায়ই ভয়ভীতি, হুমকি ও সহিংসতার সাথে যুক্ত থাকে। ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, এমনকি সাধারণ নাগরিকও নিয়মিত অর্থদাবির মুখে পড়লে সামাজিক নিরাপত্তাবোধ কমে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। যদি চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সরকারের সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সূচকে অবস্থান খারাপ হলে দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনসমর্থন হ্রাস পাবে।
চাঁদাবাজির প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এটি দমন করা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
চাঁদাবাজি দমনে করণীয়
চাঁদাবাজি দমনে করণীয় পদক্ষেপগুলো কেবল আইনগত নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সাথেও সম্পৃক্ত। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পেশাদারিকরণ-আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সমন্বয়, মানবাধিকার ও পেশাগত নীতিমালায় প্রশিক্ষণ— এর মাধ্যমে অপরাধ দমনে নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি-দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। স্বতঃপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা কার্যকর করা, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির মামলায় দ্রুত বিচার, সম্পদের হিসাব ও ঘোষণার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে প্রয়োগ, নাগরিক অভিযোগ গ্রহণের ডিজিটাল ব্যবস্থা, এতে দুর্নীতির সাথে যুক্ত চাঁদাবাজি চক্র দুর্বল হবে।
সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনতে ই-টেন্ডারিং ও ই-গভর্ন্যান্স কার্যক্রম সম্প্রসারণ জরুরি। অনলাইন টেন্ডার প্ল্যাটফর্ম বাধ্যতামূলক করা, রিয়েল-টাইম প্রকল্প মনিটরিং, আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার (Open Data) চালু করা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা সিন্ডিকেট ও কমিশনভিত্তিক অনিয়ম কমাতে সহায়ক হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় পদ থেকে অপসারণ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও অডিট বাধ্যতামূলক করা, স্থানীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলা কমিটি সক্রিয় রাখা, দলীয় কর্মকাণ্ডে সুশাসনের নীতিমালা প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া চাঁদাবাজি নির্মূল সম্ভব নয়; তাই দলের অভ্যন্তরে সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করলে চাঁদাবাজি দমনে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়ই হতে পারে টেকসই সমাধান।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে এসেছে, যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সময়ে সাংবিধানিকভাবে গুরুত্ব পায়। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা— বিশেষত ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতা— বাংলাদেশকে আরো সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান নিতে বাধ্য করছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অবকাঠামো বিনিয়োগ, সামরিক সহযোগিতা, সমুদ্রবন্দর ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল— এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশকে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এক পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে অন্য পক্ষের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত নির্ভরতা কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, শুল্কনীতি বা সামরিক সহযোগিতার শর্ত— এসব বিষয় স্বাধীন নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সীমান্ত ও অভিন্ন নদী ইস্যু : সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বাণিজ্য, সীমান্ত হত্যা এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন দীর্ঘ দিনের সংবেদনশীল ইস্যু। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে এসব প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য সমাধান নিশ্চিত করা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরীক্ষা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সমন্বয় করা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোহিঙ্গা সঙ্কট : মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি শুধু একটি শরণার্থী সঙ্কট নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিচালনা, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো ব্যয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কক্সবাজার অঞ্চলে স্থানীয় শ্রমবাজার ও সম্পদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশগত ক্ষতি (বন উজাড়, ভূমি ক্ষয়) দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদিও আন্তর্জাতিক সহায়তা রয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
নিরাপত্তাঝুঁকি : শিবিরভিত্তিক অপরাধ, মাদক ও মানবপাচার চক্র সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি। উগ্রপন্থা বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা। সীমান্তনিরাপত্তা জটিল হয়ে ওঠা। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো কঠিন করে তোলে।
বাংলাদেশ এক দিকে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, অন্য দিকে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অগ্রগতি সীমিত। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন— জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে সমর্থন অব্যাহত রাখা জরুরি। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
সঙ্কট মোকাবেলায় সম্ভাব্য কৌশল : বহুপক্ষীয় কূটনীতি জোরদার করা, আন্তর্জাতিক আদালত ও মানবাধিকার ফোরামে সক্রিয় থাকা, শিবির ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের জন্য সমান্তরাল উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রাখতে হবে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত বাস্তবতা। মানবিকতা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের সমন্বয়েই টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনই একমাত্র কার্যকর সমাধান, তবে তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত আন্তর্জাতিক চাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কেবল একটি আদর্শিক অবস্থান নয়; এটি একটি বাস্তববাদী (pragmatic) কৌশল, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। বহুমুখী কূটনীতি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত নিরপেক্ষতা— এই তিনটির সমন্বয়েই বাংলাদেশ তার স্বাধীন অবস্থান আরো সুসংহত করতে পারে।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাব্য কৌশল : বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হলে বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। প্রধান শক্তিগুলোর সাথে সমান্তরাল সহযোগিতা, কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, বিষয়ভিত্তিক (issue-based) অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, এর মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানো সম্ভব।
আঞ্চলিক জোটে সক্রিয় ভূমিকা: বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে আরো সক্রিয় ও উদ্যোগী হতে হবে, যেমন— আসিয়ান, সার্ক। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি, বাণিজ্যসুবিধা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমর্থন অর্জনের জন্য এসব প্ল্যাটফর্ম কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার : কূটনৈতিক মিশনগুলোকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ, প্রবাসী আয় ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) উদ্যোগ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা কূটনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি মজবুত করে।
প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা : প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনলে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমে। তাই দরকার বহুমুখী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, এতে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় থাকে এবং চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ে।
চাঁদাবাজি দমন সরকারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য, আর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল ভিত্তি। নতুন সরকার যদি আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নিশ্চিত করতে পারে, তবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কেবল স্লোগান নয়; এটি কৌশলগত ভারসাম্য, অর্থনৈতিক শক্তি ও আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার সমন্বিত ফল। বহুমুখী কূটনীতি, আঞ্চলিক সক্রিয়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা বৈচিত্র্য— এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ তার সার্বভৌম ও স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করতে পারে।
লেখক : সিনিয়র ফেলো, এসআইপিজি,
নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি



