প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। এই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় একটি বিষয় অনেকের নজরে এসেছে, সাবেক উপদেষ্টাদের প্রতি প্রত্যাশিত সম্মান ও আনুষ্ঠানিক মর্যাদা প্রদর্শনের অভাব। এ বিষয়টি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার দাবি রাখে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক ঘটনা নয়; এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন ঘটে। একটি সরকার দায়িত্ব শেষ করে অন্য সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে সেখানে পারস্পরিক সম্মান, সৌজন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শালীনতা বজায় রাখা একান্ত জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের কারণে তাদের প্রতি ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন করা হবে, এটিই প্রত্যাশিত ছিল।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় যদি আনুষ্ঠানিক পরিচিতি সভা আয়োজন করা হতো— যেখানে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে সাবেক উপদেষ্টাদের পরিচয় ও সৌজন্য বিনিময় হতো, তাহলে সেটি শোভন হতো। সেটি এমন ইতিবাচক বার্তা দিত যে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন দল বা মতের ঊর্ধ্বে।
শপথ অনুষ্ঠান ও দৃশ্যমান অস্বস্তি
শপথ অনুষ্ঠানের সময় যে দৃশ্যটি অনেককে বিব্রত করেছে তা হলো, সাবেক উপদেষ্টাদের একটি অনিশ্চিত ও অস্বস্তিকর অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা। তাদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রটোকল বা সুস্পষ্ট আয়োজন চোখে পড়েনি। এটি হয়তো ইচ্ছাকৃত ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রতীকী বিষয়গুলোরও বড় গুরুত্ব আছে। কারণ এসব দৃশ্য জনগণের কাছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে ধরা পড়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরোধ ও বিভাজনের সংস্কৃতি বেশি দৃশ্যমান। ফলে রাজনৈতিক সৌজন্য বা পরস্পরের অবদানের স্বীকৃতি প্রায়শই আড়ালে পড়ে যায়। এই বাস্তবতায় ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্তগুলো হতে পারে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ। যদি নতুন সরকার সাবেক উপদেষ্টাদের সাথে একটি আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ করত, তাদের ধন্যবাদ জানাত এবং দায়িত্ব পালনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত, তাহলে সেটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারত। এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেও পারস্পরিক সম্মানবোধ বাড়াতে সহায়ক হতে পারত। এতে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাও শক্তিশালী হতো।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আচরণ, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমন্বিত প্রকাশ। ক্ষমতার পালাবদলের সময় পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার অন্যতম লক্ষণ।
বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক
রাজনীতিতে মতপার্থক্য, সমালোচনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক বিষয়। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে রাজনৈতিক সৌজন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল আচরণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকার বা উপদেষ্টাদের খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। এই মনোভাব বিভিন্ন সময় তাদের আচরণে ও বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিরপেক্ষতা বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা। এ ধরনের সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ও ন্যূনতম সৌজন্য প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বিএনপির কিছু কেন্দ্রীয় নেতা প্রধান উপদেষ্টা ও অন্য উপদেষ্টাদের নিয়ে প্রকাশ্যে অসম্মানজনক মন্তব্য করেছেন। এসব মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যক্তিগত আক্রমণের রূপ নিয়েছে।
বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার একটি বড় অনুষ্ঠানে একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টাকে উদ্দেশ করে তির্যক ভাষায় বক্তব্য দেয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা হয়। এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি স্পষ্ট করে তোলে।
তবে এই পরিস্থিতি পুরোপুরি একই রকম ছিল না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টি উপলব্ধি করে কিছুটা সংযত অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দেন বলে ধারণা করা হয়। তার হস্তক্ষেপের পর প্রকাশ্য সমালোচনা ও তীব্র বক্তব্য কিছুটা কমে আসে। এর ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনাও কিছুটা প্রশমিত হয়।
তবুও বাস্তবতা হলো, দুই পক্ষের সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট ছিল। উপদেষ্টাদের সাথে বিএনপির নেতাদের দেখা হলে আনুষ্ঠানিক সালাম বিনিময় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই আচরণে আন্তরিকতার ঘাটতি অস্পষ্ট থাকেনি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে গেলে, এই সম্পর্ক সব সময় সুখকরও ছিল না। দায়িত্ব পালনের সময় বহু রাজনৈতিক নেতার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, আলাপ হয়েছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি দূরত্ব ও অস্বস্তি অনুভূত হয়েছে, যা রাজনৈতিক সৌজন্যের মানদণ্ডে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধিতা, মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সৌজন্য প্রদর্শন গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। কারণ ক্ষমতা আসে-যায়, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্ত বা দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যকর সংস্কৃতির ধারা প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়।
বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা যখন গুরুতর পর্যায়ে, তখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিষয়টি গভীর গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার শারীরিক অবস্থার অবনতিকে কেন্দ্র করে সরকার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেই সময় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এসব বৈঠকে তার চিকিৎসা পরিস্থিতি, সম্ভাব্য করণীয় এবং রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপদেষ্টা হিসেবে আমিও এসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম।
বৈঠকগুলোতে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে, যদি বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘটে, তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তার মর্যাদা ও রাজনৈতিক অবদানের কথা বিবেচনায় রেখে এসএসএফের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান, রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা, জানাজার আয়োজন এবং লাখো মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সামনে রেখে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। একই সাথে তার মরদেহ কোথায় রাখা হবে, জানাজা কোথায় অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কী ধরনের আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন করা হবে— এসব বিষয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
এ সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রটোকল নিশ্চিত করা। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিকল্পনাও এসব বৈঠকে আলোচনা করা হয়, যাতে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।
পরে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশে গভীর শোকের আবহ সৃষ্টি হয়। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে। সেই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তার রুহের মাগফিরাত কামনা ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য বিশেষ মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে আমি সেই মুনাজাত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করি।
সেদিনের সেই মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশের একজন প্রবীণ নেত্রীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সম্মান ও মানবিকতা প্রদর্শন করা হয়, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকলেও মানবিকতা, সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অপরিহার্য।
মনে রাখতে হবে, আজ যারা ক্ষমতায় আসীন তারা স্থায়ীভাবে এই অবস্থানে থাকবেন না। সময়ের বিবর্তন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় একসময় তাদেরও ক্ষমতা আরেকটি নির্বাচিত দলের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সেই মুহূর্তে যদি বর্তমান আচরণই দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা সুখকর হবে না। তাই রাজনৈতিক সৌজন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক শালীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখা সবার জন্যই জরুরি। কারণ আজ যে আচরণ করা হচ্ছে, আগামীকাল তা নিজের কাছেই ফিরে আসতে পারে। এটি মনে রাখা রাজনীতির জন্য যেমন, তেমনই রাষ্ট্রের সুস্থ ধারাবাহিকতার জন্যও অপরিহার্য।
অতীতের ঘটনার আলোকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেয়াই শ্রেয়।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম-বিষয়ক উপদেষ্টা



