উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে তিস্তা কোনো সাধারণ নদী নয়; এটি একই সাথে জীবনরেখা এবং দুর্ভাগ্যের নাম। এক দিকে কৃষির আশীর্বাদ, অন্য দিকে ভাঙন, বন্যা ও উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্ক। জাতীয় উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যানের আড়ালে তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘশ্বাস আজও অদৃশ্য রয়ে গেছে।
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার বাড়িঘর তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এ সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি হাজারো পরিবারের ইতিহাস মুছে যাওয়ার গল্প। এমন পরিবার আছে, যাদের বাড়ি একবার নয়, দশবার, বারবার, এমনকি সতেরবার পর্যন্ত ভেঙেছে। চার-পাঁচবার ঘর হারানো মানুষের সংখ্যা বিপুল। একটি মানুষ কতবার নতুন করে ঘর বাঁধবে?
ক্ষয়ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকও। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ নদীতে তলিয়ে গেছে। অর্থাৎ শিক্ষা, ধর্মীয় জীবন, সামাজিক কাঠামো, সবই ভেঙে পড়েছে। হাজারো শিশু স্কুলছুট হয়েছে, গ্রাম হারিয়েছে তাদের মানচিত্র। অথচ পুনর্বাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো বলে, রাষ্ট্র তাদের পাশে নেই।
ভাঙনের ভয়াবহতা ও অবহেলা : তিস্তার প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকা অতি ভাঙনপ্রবণ। এসব এলাকায় প্রতি বর্ষায় মানুষ আতঙ্কে দিন কাটায়। সরকার ভাঙনরোধে ২৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে কিছু কাজ শুরু করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অস্থায়ী বাঁধ বা বালুর বস্তা দিয়ে এমন প্রমত্ত নদীকে থামানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, সময়মতো স্থায়ী স্পার, ড্রেজিং ও নদীশাসন করলে মাত্র কয়েক কোটি টাকায় শত শত কোটি টাকার ক্ষতি রোধ করা যেত; কিন্তু পরিকল্পনার অভাব, অগ্রাধিকারহীনতা ও রাজনৈতিক উদাসীনতায় পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হয়েছে। ভাঙনরোধ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব। একটি বাড়ি ভাঙা মানে একটি পরিবারের শিকড়হীন হয়ে পড়া। মানুষ উদ্বাস্তু হলে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়ের পথ সবই ভেঙে পড়ে। উন্নয়ন তখন অর্থহীন হয়ে যায়।
উন্নয়ন বৈষম্যের প্রশ্ন : গত এক দশকে দেশে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ১০টিরও বেশি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে– সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়; কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের বেঁচে থাকার প্রকল্প কি অগ্রাধিকার পেয়েছে?
তিস্তা মেগা প্রকল্পটি কেবল অবকাঠামো নয়, এটি সরাসরি জীবনের নিরাপত্তার প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের অস্তিত্ব এর সাথে জড়িত। তবু এটি বছরের পর বছর ঝুলে আছে। ফলে তিস্তাপাড়ের মানুষের মনে ক্ষোভ– তারা কি রাষ্ট্রের উন্নয়নের বাইরে?
নদীর চরিত্র ও সঙ্কট : ভুটানের পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রায় ২৪০ মাইল দীর্ঘ তিস্তা জলপাইগুড়ির গজলডোবা ব্যারাজ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা হয়ে প্রবাহিত এই নদী একসময় ছিল গভীর ও প্রশস্ত। এখন পলি জমে নাব্য কমেছে। ফলে অল্প পানিতেই বন্যা, আবার শুষ্ক মৌসুমে খরার মতো অবস্থা। অর্থাৎ তিস্তা এখন দ্বৈত সঙ্কটে– বর্ষায় ধ্বংস, শুষ্ক মৌসুমে মৃত্যু।
পানি রাজনীতি ও চুক্তিহীনতা : তিস্তার সঙ্কটের আরেকটি বড় কারণ আন্তর্জাতিক। উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজে পানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানি কমে যায়। কৃষকরা সেচ পায় না, ফসল নষ্ট হয়।
একসময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির আলোচনা এগোলেও কার্যকর চুক্তি হয়নি। ফলে বাংলাদেশকে একতরফা ক্ষতির মুখে থাকতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে যৌথ ব্যবস্থাপনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি খুবই ধীর।
চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব : সম্ভাবনা না ভূ-রাজনীতি
এই প্রেক্ষাপটে সামনে আসে তিস্তা ব্যারাজ অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ প্রস্তাব। কয়েক বছর আগে চীন প্রায় এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে একটি সমন্বিত তিস্তা অববাহিকা উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রস্তাব করে। এতে ছিল নদী ড্রেজিং ও নাব্য বৃদ্ধি, স্থায়ী বাঁধ ও নদীশাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সেচ সম্প্রসারণ, নদীতীর সংরক্ষণ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক জোন উন্নয়ন।
অর্থাৎ কেবল ভাঙন রোধ নয়, পুরো অববাহিকার সমন্বিত উন্নয়ন। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও শিল্পে বড় পরিবর্তন আসতে পারত। লাখো মানুষ সরাসরি উপকৃত হতো। দীর্ঘ দিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতো।
কিন্তু বিষয়টি দ্রুতই ভূরাজনীতির জটিলতায় আটকে যায়। তিস্তা সীমান্তবর্তী নদী হওয়ায় ভারত এ অঞ্চলে চীনা সম্পৃক্ততা নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করে। ফলে প্রকল্পটি কূটনৈতিক ভারসাম্যের খেলায় ঝুলে থাকে।
প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন কি ভূরাজনীতির জিম্মি হবে? উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন কি আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি হবে?
বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া। যে দেশই বিনিয়োগ করুক, শর্ত হতে হবে– স্বচ্ছতা, স্থায়িত্ব এবং জনগণের উপকার। উন্নয়ন যেন কারো কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার না হয়। আবার রাজনৈতিক ভয়ে প্রয়োজনীয় প্রকল্প আটকেও না থাকে।
কী চায় তিস্তাপাড়ের মানুষ : তাদের দাবি খুবই সহজ– স্থায়ী ভাঙনরোধ, নিয়মিত ড্রেজিং, পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি। এর সাথে এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি দাবি– সমন্বিত অববাহিকা উন্নয়ন, যাতে নদীকে শত্রু নয়, সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
তিস্তা কেবল একটি নদী নয়– এটি রাষ্ট্রের নৈতিকতার পরীক্ষা। উন্নয়ন যদি মানুষের জীবন রক্ষা করতে না পারে, তবে সে উন্নয়ন অর্থহীন। সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল–এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিশুর মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ।
তিস্তাপাড়ের মানুষ আজও অপেক্ষা করছে– একটি কার্যকর পরিকল্পনা, একটি সাহসী সিদ্ধান্ত, একটি মানবিক রাষ্ট্রের। তিস্তা এখনো ভাঙছে। কিন্তু প্রশ্নটা নদীর নয়– রাষ্ট্রের। আমরা কি এবার সত্যিই তিস্তাকে বাঁচাব, নাকি আবারো তাকে রাজনীতি ও অবহেলার পানিতে ডুবতে দেবো?



