ওয়ার্ল্ড অর্ডারে পরিবর্তন আসন্ন

বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস ঘনিয়ে আসছে। আমেরিকার অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসন স্পষ্ট হচ্ছে। বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিন আসছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থান ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও যৌথতা তৈরি করছে। শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের ধারণা বিলীয়মান। গ্লোবাল নেতৃত্বের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে নতুন ঋতু ক্রমেই বাহুবিস্তার করছে। পোস্ট-ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড ধারণা হাজির হচ্ছে সবলে। শক্তির একক আধিপত্য ক্রমেই বিলীন হয় এবং বহুপক্ষীয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও নৈতিক ভিত্তির ওপর গঠিত বিশ্বব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে। প্রকৃত স্থিতিশীলতা আসে ন্যায়, সমমর্যাদা, সমন্বয় ও অংশীদারত্বের মধ্য দিয়ে

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত বিশ্বব্যবস্থা মূলত জোট ও অংশীদারত্বের নৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি শুধু সামরিক আধিপত্য নয়; বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক প্রাধান্যের এক জটিল নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচিত হতো। এখানে জোট ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর স্বেচ্ছাস্বীকৃত সহযোগিতা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা। প্রবল সেনাশক্তি তাতে ছিল। কিন্তু এ ব্যবস্থার গতিশীলতা নিশ্চিত হতো সম্মিলিত দায়িত্ব, অর্থায়ন, মানবসম্পদ ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। ১৯৯১ সালের কুয়েত অভিযান বা ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসন এর উদাহরণ। এতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে কাজ করেনি; বরং ন্যাটো মিত্র, আরব রাষ্ট্র ও এশিয়ার অংশীদার রাষ্ট্রগুলো তাদের সৈন্য, রসদ ও অর্থায়ন দিয়ে এই জোটকে কার্যকর করেছে। এই প্রক্রিয়া কেবল সামরিক সমন্বয়ে সীমিত নয়; বরং তা ছিল এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রকাশ।

তবে সাম্প্রতিক সঙ্কট, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে এই জোট ব্যবস্থার মধ্যে ফাটল এবং বিশ্বাসের ঘাটতি প্রকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্ররা নিজেদের মতো পথ খুঁজছে। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, স্পেন ইরানের মুখোমুখি হওয়া থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তেমনি পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের বাইরে নিজেদের স্বতন্ত্র দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করছে। এই পরিবর্তন কেবল সামরিক সমন্বয়ের ঘাটতি নয়; বরং তা ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পুনর্বিন্যাসের সূচনা করছে। জোটের মধ্যে স্বার্থবৈষম্য, ভিন্ন নীতিমালা ও একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের ঘাটতি তৈরি করেছে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র; যা দেশটিকে এককভাবে পথচলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্থিতির জন্য বিপজ্জনক।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিশ্বাস অংশীদারত্বের এই ক্ষয়, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে শুধু বস্তুগতভাবে সীমিত করছে না; বরং আমেরিকার নৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্যের ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর ফলে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো এখন ভেঙে পড়ছে। ইরানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই ভাঙন টের পাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র কেবল তার শক্তি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা অনুভব করছে না; বরং রাজনৈতিক প্রভাব, কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক কাঠামো নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সামনে তা আরো বাড়বে।

জোটভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ বিভাজন ও স্বতন্ত্র চুক্তি গ্রহণ মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বহুপক্ষীয় বাস্তবতার প্রতিফলন, যা মার্কিন নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় আধিপত্যকে দুর্বল করছে। একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাব্য পুনর্গঠনের পথ সুগম করছে। এটি আর কেবল হরমুজ বা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের প্রসঙ্গ নয়; এটি গ্লোবাল নেতৃত্ব ও ক্ষমতার কাঠামোর পুনর্নির্ধারণের সূচনা।

যে বিশ্বব্যবস্থা মার্কিন নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কেবল সামরিক আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং এটি গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সাপ্লাই চেইন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে আরো বড় ভূমিকা নিচ্ছে। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি শক্তি এবং অন্যান্য উদীয়মান শক্তির বৃদ্ধি মার্কিন আধিপত্যকে নতুন এবং জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির বিএএসএফ চীনে নতুন কারখানা স্থাপন করেছে। যা প্রমাণ করে, একসময়ের প্রাধান্যশীল অর্থনৈতিক অংশীদাররা এখন স্বাধীন বাণিজ্যিক নীতি গ্রহণ করছে। সৌদি আরব তেল সরবরাহে রাশিয়ার সাথে অগ্রগতি মার্কিন দখলদারি পরিকল্পনা সীমিত করেছে। কানাডা চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কে গুরুত্ব দিচ্ছে; অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব কমে আসছে। যা তার নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও বিকল্প শক্তির উত্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করছে এক নতুন, বহুকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মোকাবেলা করতে।

সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমিত নয়। প্রশান্ত মহাসাগর ও আর্কটিক অঞ্চলে শক্তির খেলা তীব্র হচ্ছে। বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে দেশগুলো বন্ধুত্বভিত্তিক লাইন (friendshoring) বা নিরাপদ জোটের দিকে ঝুঁকছে, যা বহুপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্যের আগে আরো ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে। সমসাময়িক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে পেট্রোডলারভিত্তিক বাণিজ্যে মূল্য হিসাব চীনের ইউয়ান বা অন্যান্য মুদ্রায় অবতরণের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান; যা বিশ্বে আর্থিক আয়োজনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রযুক্তিভিত্তিক নেতৃত্বের লড়াই ক্রমবর্ধমান। বিশেষত এআই, সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণের মতো বিষয় এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন শাখা হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে যুদ্ধ, জ্বালানি সঙ্কট ও পরিবেশগত চাপ বিশ্বকে নতুন বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে। যেখানে আগের নিয়ম আর টিকে থাকতে পারছে না।

তা ছাড়া আগ্রাসন নীতি আমেরিকাকে চড়ামূল্য ফেরত দিচ্ছে। ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়া বুমেরাং ইফেক্ট সৃষ্টি করেছে। এসব দেশে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা, উচ্চ ব্যয় এবং রাজনৈতিক ক্ষতি ভোগ করেছে, করছে। এ মুহূর্তে ইরানের সাথে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে একপাক্ষিকভাবে বিপজ্জনক সামরিক ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন ও বহুস্তরের পরীক্ষায় ফেলেছে, যা ভিয়েতনামের চেয়েও বহুগুণ বিপজ্জনক। এতে তার সামরিক শক্তি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে। আবার একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক ক্ষতির চিত্রও ফুটে উঠছে।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও নৈতিকতার ছাপ দিয়ে নিজেদের আধিপত্যকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই বৈধতার কৃত্রিম পর্দা সরে গেছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এই নিয়মনীতির ব্যবহার মূলত স্বার্থভিত্তিক ও সিলেক্টেড। গাজার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর প্রতি ইসরাইলের হামলার উদাহরণ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। মার্কিন নেতৃত্বে থাকা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের প্রতি অব্যাহত সমর্থন দেখিয়েছে, এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও তারা তা উপেক্ষা করেছে। ইসরাইলের গণহত্যা তাদের কাছে প্রশ্রয় ও সহায়তা শুধু পায়নি, উপভোগ্যও হয়ে উঠেছে; যা দশকের পর দশক ধরে চলমান। এতে স্পষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির নৈতিক ভিত্তি মূলত পশ্চিমা ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার জন্য ব্যবহার হয়।

এই বাস্তবতা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার নৈতিকতা ও বৈধতার সঙ্কটকে প্রকাশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে বিশ্বব্যবস্থাকে ন্যায়, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করত, সেই ধারণার ভণ্ডামি ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী ও পরিবেশের মতো বিষয়ে পশ্চিমের স্ববিরোধ আড়াল করার প্রতিটি চেষ্টা নিজেকেই বিদ্রূপ করছে।

ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর দুর্দশা এবং পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতি কোনোভাবেই গোপন থাকেনি। ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য পশ্চিমের প্রবল সহানুভূতি, আর গাজার শরণার্থীদের প্রতি প্রকাশ্য উদাসীনতা কে লক্ষ করেনি?

বর্তমান সঙ্কটে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা একক স্বার্থ এবং একপাক্ষিক নীতির ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কাল বিশেষভাবে এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন এককভাবে বৃহত্তর বৈশ্বিক ঝুঁকি এবং সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা মোকাবেলায় বাধ্য হচ্ছে; যা দীর্ঘমেয়াদে তার নেতৃত্ব এবং সামরিক আধিপত্যের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের ধারণা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। এর ফলে বিশ্বব্যবস্থায় নতুন কৌশলগত ভারসাম্য গঠনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাবনা। চীন, রাশিয়া, ইরান ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নীতির সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগাচ্ছে। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, সামরিক ও কৌশলগতভাবে তারা নতুন বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র তৈরি করছে, যা একক রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে সীমিত করে। একই সাথে একটি নতুন বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সূচনা ঘটাচ্ছে। এখানে ঐতিহাসিক আধিপত্য, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক প্রভাবের একক কর্তৃত্ব থাকবে না; বরং এটি বহু শক্তির সমন্বয়, স্বার্থের ভারসাম্য ও অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একক আধিপত্যের বিপরীতে বৃদ্ধিশীল চ্যালেঞ্জার রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে। রাশিয়া, চীন ও ইরান কেবল সামরিক শক্তি বা ভূরাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নয়, বরং অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে। চীন বিশ্ববাণিজ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করছে, রাশিয়া জ্বালানিসম্পদ ও সামরিক শক্তি কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব তৈরি করছে, ইরান নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কৌশল ও অঞ্চলের সংযোগ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে চেপে ধরছে। এসব রাষ্ট্র ক্রমেই এমন এক বহুপক্ষীয় বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে একাধিপত্যবাদী মার্কিন অবস্থান অপ্রভাবী ও সীমিত। এর মানে পরিষ্কার। একক নেতৃত্বের ধারণা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে এবং বিশ্বরাজনীতিতে বহু কেন্দ্রের সমন্বয় ও ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র তার জোটকাঠামো হারায়, তবে তার সঙ্কট কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তাকে একটি নতুন, অজানা ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। যেখানে বিশ্বব্যাপী তার ঐতিহাসিক প্রভাব, নেতৃত্ব ও আধিপত্যের সূর্যাস্তগামী হতে থাকবে। একসময় সে আবিষ্কার করবে, খোদ আমেরিকায় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কবলে। এ পরিস্থিতির বার্তা স্পষ্ট। আমেরিকা কৌশলগতভাবে কেবল বিপদে পড়েনি, বরং প্রশ্ন হলো, তার নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা কি শেষবেলার মুখোমুখি?

বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস ঘনিয়ে আসছে। আমেরিকার অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসন স্পষ্ট হচ্ছে। বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিন আসছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থান ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও যৌথতা তৈরি করছে। শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের ধারণা বিলীয়মান। গ্লোবাল নেতৃত্বের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে নতুন ঋতু ক্রমেই বাহুবিস্তার করছে। পোস্ট-ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড ধারণা হাজির হচ্ছে সবলে। শক্তির একক আধিপত্য ক্রমেই বিলীন হয় এবং বহুপক্ষীয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও নৈতিক ভিত্তির ওপর গঠিত বিশ্বব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে। প্রকৃত স্থিতিশীলতা আসে ন্যায়, সমমর্যাদা, সমন্বয় ও অংশীদারত্বের মধ্য দিয়ে।

লেখক : কবি, গবেষক

[email protected]