বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, আমাদের ঝুঁকি

অর্থাৎ যুদ্ধের গোলা যদি তেহরানে পড়ে, তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি ঢাকায় শোনা যেতে পারে ডলারের বাজারে, বিদ্যুতের খরচে কিংবা বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত রেমিট্যান্স। দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন। বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় বড় ঝুঁকি রফতানি খাতে। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্প, যা মূলত পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অবস্থাদৃষ্টে বলতে হয়– ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ফায়ার না হওয়া পর্যন্ত গুলি-বোমা কেবলই একটি বস্তু। ফারারের পরই তা বিধ্বংসী মারণাস্ত্র। যেখানে পড়ে সেখানে নারী-শিশু, বৃদ্ধ, ধার্মিক-অধার্মিক, দ্বীন-বেদ্বীন চেনে না। ম্যাসাকারে সব একাকার করে দেয়। আর বিশ্বায়নের অনিবার্য জেরে মারণাস্ত্র বিশ্বের যে গোলার্ধেই পড়ুক তার জের, তাপ-উত্তাপ তথা ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত হতে হয় গোটা বিশ্বকে। ইরান যুদ্ধের উত্তাপে পুড়ছে বাংলাদেশও।

উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি-না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বুধবার এ তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর এ তথ্য জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ তদন্ত করা হবে। বাংলাদেশ এমন বিষয়ে নিশানা হওয়ার কথা নয়। দেশটির নাম আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতরের বিজ্ঞপ্তি পড়ে আসমান ভেঙে পড়ার অবস্থা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের। বিষয়টি চরম অস্বস্তির।

বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদনে মেধাস্বত্বের চর্চা এখনো সীমিত। মার্কিন ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজারও খুবই ছোট। পণ্য রফতানিতে প্রণোদনাও খুবই অল্প। কৃষিতে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়ে কিছু প্রশ্ন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তো নিজেই কৃষিতে প্রণোদনা দেয়। বাংলাদেশে দেওয়া হয় শুধু সারে। যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এমন কাজ কেন করল অনেকের মাথায় আসছে না। এটি এ সময়ে ধারণারও বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেদের স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় থেকে এমন তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে, না বিশ্বে নতুন আরেকটি গোলযোগ বাধানোর জন্য করেছে, ভেবে কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড়। সেখানে বাংলাদেশের রফতানির বড় অংশই তৈরী পোশাক। তদন্তে যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে, তা হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি, পদক্ষেপ বা উৎপাদনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি-না এবং সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি-না।

এমনিতেই চলমান ইসরাইল-ইরান সঙ্ঘাতের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি বড় সঙ্কটে পড়েছে। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা এখনো সইতে হচ্ছে। মাত্রাগতভাবে এবারের ধাক্কা আরো তেজি। জ্বালানি প্রশ্নে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকার জ্বালানি সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ চালু করেছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা বেড়েছে। আমদানি করা গ্যাসের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা জাতীয় বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাতের ঝুঁকি আছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে বড় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো এশিয়াজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৮৫টি দেশে তেলের দাম বেড়েছে। এ তালিকায় বাংলাদেশ না থাকলেও এরই মধ্যে যে চাপ পড়েছে তা আগামী কয়েক দিন চললে অবস্থা কঠিনতর হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে আফগানিস্তানে (৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ)। এরপর পাকিস্তানে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর বাইরে, মিয়ানমারে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এমনকি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল উৎপাদক কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তেলের দাম বেড়েছে। প্রতিবেশী ভারতের পুনে শহরে সাময়িকভাবে গ্যাস দিয়ে মরদেহ দাহ করা বন্ধ রাখা হয়েছে। চিতায় কাঠ বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। নিয়মিত গাড়ি চালকদের চাহিদা কমাতে পাকিস্তান পেট্রোলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। তবে, ট্রাক ও বাস চলাচল সচল রাখতে ডিজেলের দাম তুলনামূলকভাবে কম রেখেছে।

যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর থেকেই তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে সতর্কতা বেড়েছে, অনেক জাহাজ বিকল্প পথ খুঁজছে এবং পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল শোধনাগার এবং কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি স্থাপনাগুলো ঘিরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অস্বাভাবিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্ঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছে। এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকেও অস্থায়ী ছাড় দিলে তা অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে বলে ভাবছে সরকার। ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তবে এরই মধ্যে ইরানের সাথে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় হিসাবে রাশিয়ার মধ্যস্থতাপ্রত্যাশি যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি রাশিয়ার তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।

তার পরও যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে কী দশা হবে বলা মুশকিল। কিন্তু এ পর্যন্ত যা হয়েছে, যে সর্বনাশ হয়েছে তা-ইবা কীভাবে সামলাবে বাংলাদেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ইরান তাকে ছাড়ছে না। পুতিনের মধ্যস্থতা কতটা সফল হবে বলার উপায় নেই।

আবার আগ্রাসন বা যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি, ক্ষেপণাস্ত্র বা কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সঙ্ঘাতও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতকে শুধু রাজনীতি বা ভূরাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখে না; তাদের অনেকেই মনে করে, এসব ঘটনার মধ্যেই বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে উঠছে। এ বিশ্বাসে লাখ লাখ মানুষকে বড় করা হয়েছে। এ ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইবেলের ‘ইজেকিয়েল’ গ্রন্থের ৩৮ নম্বর অধ্যায়। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে জোট বাঁধবে। অনেকের মতে, সেখানে উল্লেখ করা পারস্য বলতে আজকের ইরানকে বোঝানো হয়েছে।

বয়ানে যা-ই থাক বাস্তবে এ সর্বনাশের প্রভাব অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কারণ ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, উপসাগরীয় ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের একটি কৌশলগত কেন্দ্র। কেবল তেল বা জ্বালানি নয়, একই সাথে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বন্ডের আয়ের ওঠানামা এবং জ্বালানি পরিবহনে নিরাপত্তা ঝুঁকি, সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন চাপে পড়েছে। সঙ্কটের কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালী। ইরানসংলগ্ন এই কৌশলগত প্রণালীতে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সঙ্কটের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানির ব্যয়ও বাড়বে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। ডলারের চাহিদা বাড়বে এবং টাকার মান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

অর্থাৎ যুদ্ধের গোলা যদি তেহরানে পড়ে, তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি ঢাকায় শোনা যেতে পারে ডলারের বাজারে, বিদ্যুতের খরচে কিংবা বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত রেমিট্যান্স। দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন। বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় বড় ঝুঁকি রফতানি খাতে। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্প, যা মূলত পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অবস্থাদৃষ্টে বলতে হয়Ñ ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]