ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মোড় বদলের নাম। বহুদিন পর মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছে। লাইন দিয়েছে। অপেক্ষা করেছে। ব্যালট বাক্সে হাত রেখেছে। ভোটকেন্দ্র ছিল উৎসবের মতো। মুখে ছিল হাসি। চোখে ছিল প্রত্যাশা। এর আগে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, সেগুলো ছিল নির্বাচন নামের প্রহসন। একতরফা। রাতের ভোট। ডামি প্রার্থী। ভোটারবিহীন কেন্দ্র। মানুষ ভোট দিতে পারেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেছেন ‘নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ’- যেখানে ভোট থাকে, কিন্তু পছন্দ থাকে না। এবার সেই চিত্র ভেঙেছে। ভোটার ফিরেছে। আশাবাদ ফিরেছে। মানুষ বুঝেছে, তার একটি ভোট রাষ্ট্রকে বদলাতে পারে।
দেশের কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতা হয়েছে। উত্তেজনা হয়েছে। এগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে সীমিত সহিংসতা পুরো প্রক্রিয়াকে বাতিল করে না। প্রশ্ন আসে মাত্রার ওপর। এবারের নির্বাচনে সেই মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোট গণনার সময়। কয়েকটি আসনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ এসেছে যে সরকার গঠনের মতো আসন নিশ্চিত হওয়ার পর কিছু জায়গায় প্রভাব বলয় তৈরি করা হয়েছে। ফল পাল্টে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। এই অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অভিযোগের ভাষা গুরুতর। গণতন্ত্রে এমন অভিযোগ হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।
তবে এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও স্পষ্ট। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্য এই কাজটি প্রয়োজন ছিল না। কয়েকটি বিতর্কিত আসন ছেড়ে দিলেও বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনেই বিজয়ী হতো। তবু কেন এই অতিরিক্ত আগ্রহ? কেন এই অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দল ক্ষমতায় এলে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা দেয়।
এটাকে তারা বলেন ‘বিজয়ী মানসিকতার অতিরঞ্জন’। এখানেই আত্মসংযমের পরীক্ষা হয়। এই পরীক্ষায় সামান্য ব্যর্থতাও বড় বার্তা দেয়।
নির্বাচনের ফলাফলের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি চূড়ান্ত ঘটনা ঘটে গেছে।
প্রথমত, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সম্পূর্ণ গণভিত্তির পতন’।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি কার্যত রাজনীতির মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। একটি আসনেও জয় নেই। এমনকি অনেক জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাই তৈরি করতে পারেনি। নির্বাচনী রাজনীতিতে এটি একটি দলীয় মৃত্যুঘণ্টা।
তৃতীয়ত, বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। এটি শুধু সংখ্যা নয়। এটি জনমতের স্পষ্ট নির্দেশ। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। মানুষ পুরনো বন্দীদশা থেকে বেরোতে চেয়েছে।
চতুর্থত, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। তারা সংসদে প্রধান বিরোধীদল হয়েছে। এটি তাদের জন্য শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, একটি কাঠামোগত স্বীকৃতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, শক্তিশালী বিরোধীদল ছাড়া সংসদ কার্যকর হয় না।
পঞ্চমত, এই সংসদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো নতুন মুখের আধিক্য। ৪৬ জনের মতো প্রার্থী আগে সংসদ সদস্য ছিলেন। বাকিরা সবাই নতুন। অনেক সাবেক এমপি পরাজিত হয়েছেন।
জনগণ পুরনো মুখের ওপর আর আস্থা রাখেনি। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেতৃত্বের পরিবর্তন। যিনি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন এবং যিনি বিরোধী নেতা হচ্ছেন- দুজনেই প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ‘নতুন নেতৃত্বের উত্থান’। এই সংসদে তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তরুণ এমপি বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম কথা বলবে। প্রশ্ন তুলবে। ডিজিটাল যুগের দাবি তুলবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, তরুণ প্রতিনিধিত্ব বাড়লে নীতিনির্ধারণে গতি আসে।
তবে এখানেই দায়িত্বও বাড়ে। বিএনপি এখন এককভাবে শক্তিশালী। সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিপুল। এই অবস্থায় বিরোধী দলকে দমন করার সুযোগ আছে। প্রশাসনকে দলীয়করণের সুযোগ আছে। কিন্তু গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা এই সুযোগ নেয় কি না, তার ওপর।
এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে- মানুষ ভোট দিতে চাইলে কোনো শক্তি তাকে আটকাতে পারে না। আবার এটাও প্রমাণ করেছে- অতিরিক্ত ক্ষমতা নিজেই নিজের শত্রু। এখন সময় সংযমের। সময় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার। সময় বিরোধী কণ্ঠকে শ্রদ্ধা করার। সময় ভুল হলে স্বীকার করার। এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে নতুন জীবন দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই- এই জীবনকে টিকিয়ে রাখা যাবে তো? ইতিহাস খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।
নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন। অন্যদিকে সেই গণতন্ত্রকে সংহত করার কঠিন পরীক্ষা। ভোটের মাধ্যমে আমরা গণতন্ত্রে ফিরে এসেছি।
এটি একটি বড় অর্জন। কিন্তু ইতিহাস বলে, গণতন্ত্রে ফেরা যতটা সহজ, টিকিয়ে রাখা ততটাই কঠিন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’ আর ‘ডেমোক্রেটিক কনসোলিডেশন’ এক জিনিস নয়। ভোট মানেই গণতন্ত্র নয়। ভোট হলো দরজা। ভেতরে ঢুকে প্রতিষ্ঠান গড়া আসল কাজ। এই জায়গায় নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। এবং সব চ্যালেঞ্জ একসাথে হাজির।
সংকটকালে জাতির মধ্যে ঐকমত্য গড়তে না পারলে গণতান্ত্রিক যাত্রা থেমে যায়। এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য। আমরা আরব বসন্ত পরবর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়।মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া-সবখানেই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। ভোটও হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। ফলাফল কী হয়েছে, তা সবার জানা।
গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। কর্তৃত্ববাদ আরো ভয়ংকর রূপে ফিরে এসেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো বিজয়ী দলের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং পরাজিত পক্ষকে কোণঠাসা করা। বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কতা এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হলো প্রশাসন ও আমলাতন্ত্র। গত দেড় দশকে আমলাতন্ত্রে ব্যাপক রাজনীতিকরণ হয়েছে। প্রমোশন। পোস্টিং। শাস্তি। সবকিছু রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করেছে। এর ফলে আমলাতন্ত্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি দলীয়। আরেকটি বঞ্চিত।
বর্তমান আমলাতন্ত্রের ভেতরেও এই বিভাজন প্রবল। এখন প্রশ্ন হলো- নতুন সরকার কোন পথে যাবে? আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কি আবারো প্রধান হয়ে উঠবে? নাকি পেশাদারিত্বই হবে মূল মানদণ্ড? মেধাভিত্তিক, নিয়মতান্ত্রিক, আইননিষ্ঠ আমলা থাকবে? নাকি আনুগত্যই প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়াবে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, আমলাতন্ত্র দলীয় হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। কারণ তখন সিদ্ধান্ত হয় রাজনৈতিক স্বার্থে। জনস্বার্থে নয়।
নতুন সরকার যদি এই জায়গায় ব্যর্থ হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে। দল ও সরকার একাকার হওয়ার বিপদ্টা- হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল দল ও সরকারকে একাকার করা। সরকার মানেই দল। দল মানেই রাষ্ট্র। এর ক্ষতি হয়েছে দলেরও। ক্ষতি হয়েছে দেশেরও। সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো দলীয় সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষক সংগঠন। আইনজীবী সংগঠন। সাংবাদিক সংগঠন। সবই ছিল ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন।
এই প্রবণতা আমরা গত ১৮ মাসেও দেখেছি। যখন কোনো ব্যক্তি একদিকে দলীয় পদধারী, অন্যদিকে কোনো পেশাজীবী সংগঠনের নেতা- তখন সেই সংগঠন আর স্বাধীন থাকে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, গণতন্ত্র টিকে থাকে স্বাধীন সামাজিক পরিসরের ওপর ভর করে। যদি সেই পরিসর দল দখল করে নেয়, তাহলে গণতন্ত্র ফাঁপা হয়ে যায়। নতুন সরকার এই বাস্তবতা কীভাবে দেখবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
নির্বাচনের পরপরই যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উঠছে, তা হলো চাঁদাবাজি ও দখলবাজি। ক্ষমতার পালাবদলে বাংলাদেশে একটি পরিচিত চিত্র দেখা যায়। নতুন ক্ষমতা। নতুন দখল। নতুন চাঁদা।
যদি এই চক্র আবার শুরু হয়, তাহলে মানুষের আশাভঙ্গ হবে দ্রুত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের বৈধতা সবচেয়ে দ্রুত নষ্ট হয় আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থ হলে।
অর্থনীতি নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। মুদ্রাস্ফীতি। কর্মসংস্থান সংকট। বিনিয়োগে আস্থাহীনতা। তরুণদের প্রত্যাশা সবচেয়ে স্পষ্ট। তারা কাজ চায়। সুযোগ চায়। মেধার মূল্যায়ন চায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠী যদি হতাশ হয়, তাহলে গণতন্ত্র সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ হতাশ তরুণ সহজেই চরমপন্থা বা কর্তৃত্ববাদে ঝুঁকে পড়ে।
বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা হলো পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব। উন্নত দেশে সরকার বদলায়। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি বদলায় না। বাংলাদেশে উল্টো। সরকার বদলালেই অবস্থান বদলায়। নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো ভারত। এই সম্পর্ক কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে? আনুগত্য ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে? নাকি মর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট রাষ্ট্রের কূটনীতি সবচেয়ে কার্যকর হয় আত্মমর্যাদা ও স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে- এটা বাস্তবতা। কিন্তু সেই সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে, নাকি নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে- সেটাই আসল প্রশ্ন।
গণভোটের রায় : এখন পিছানোর সুযোগ নেই
এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের নির্বাচন নয়। এটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর গণভোট। রায় স্পষ্ট। ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে ‘হ্যাঁ’-তে। ২৩ শতাংশ ‘না’। এই ফলাফল কোনো দ্ব্যর্থহীন বার্তা
নয়। এটি জনগণের সুস্পষ্ট নির্দেশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, গণভোটে যখন দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি সমর্থন আসে, তখন সেটি আর রাজনৈতিক মতামত থাকে না- তা হয়ে ওঠে সাংবিধানিক নির্দেশনা।
এই গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন বাস্তবায়নের। জুলাই সনদে যে প্রস্তাবগুলো রয়েছে, সেগুলো হালকা নয়। উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বিধান। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপদ্ধতির সংস্কার। এগুলো ক্ষমতার কাঠামো বদলানোর প্রস্তাব। রাষ্ট্রের ভারসাম্য ফেরানোর প্রস্তাব।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংসদ ১৮০ দিনের জন্য একটি গাঠনিক ক্ষমতা পেয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। এই সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি সীমিত। এবং এটি একবারের। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ট্রানজিশনাল মুহূর্তে সময় নষ্ট করাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। সুযোগ জানালা বন্ধ হলে তা আবার খুলতে দশক লেগে যায়।
নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ তাই খুব পরিষ্কার। গণভোটের রায়ের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান। এখানে ‘কিন্তু’ চলবে না। এখানে ‘পর্যালোচনা’ দিয়ে সময়ক্ষেপণ চলবে না। এখানে ‘কমিটি’ করে ফাইল চাপা দেয়ার সুযোগ নেই। জনগণ যদি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দেয়, আর সরকার যদি সেখানে গাফিলতি করে, তাহলে শুরুতেই সরকারের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়বে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের বৈধতা সবচেয়ে দ্রুত নষ্ট হয় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মাধ্যমে।
একই সাথে বিরোধী দলের অবস্থানও বদলে যাবে। এবার বিরোধী দল দুর্বল নয়। তারা সংসদে আছে। সংখ্যায় আছে। রাজনৈতিক শক্তিও আছে। ১৮০ দিনের মধ্যে যদি সংস্কার প্রশ্নে অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে সংঘাত অনিবার্য। রাস্তায় রাজনীতি ফিরবে। সংসদের বাইরে চাপ বাড়বে। আমরা জানি, এই ধরনের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। কিন্তু আমরা এটাও জানি- এ ধরনের সংঘাতই অতীতে গণতান্ত্রিক যাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছে।
এই গণভোটের রায় আসলে একটি শেষ সুযোগ। রাষ্ট্র সংস্কারের। প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের। ক্ষমতার ভারসাম্য ফেরানোর। এটি বাস্তবায়ন না হলে দায় শুধু সরকারের নয়। পুরো রাজনৈতিক শ্রেণির। গণভোটের রায়কে অমান্য করা মানে জনগণের সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করা। আর জনগণের সিদ্ধান্ত অস্বীকার করে কোনো সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংস্কার, না সংঘাত। ইতিহাস অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশ ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফিরেছে। এটি ছোট অর্জন নয়। কিন্তু এখন বড় পরীক্ষা সামনে। ঐকমত্য। প্রতিষ্ঠান। আইনের শাসন। পেশাদার প্রশাসন। স্বাধীন সামাজিক পরিসর। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে ইতিহাস আবারো কঠিন হবে। সফল হলে বাংলাদেশ সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে এগোবে। গণতন্ত্র সুযোগ দেয়। কিন্তু অনন্তকাল অপেক্ষা করে না।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



