মানুষ আজ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। সমাজের সর্বস্তরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, সৎভাবে বেঁচে থাকার মূল্য কি সত্যি আর আছে? ঋণখেলাপি, অপরাধী এবং দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ শুধু জন্ম নেয় না, তা জমে ওঠে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অপমানের উপলব্ধিতে। যারা দিনরাত পরিশ্রম করেন, কর দেন, ঋণ শোধ করেন, আইন মেনে চলেন, তাদের কাছে এটি তীব্র মর্মপীড়ার কারণ। মনে হয়, এই রাষ্ট্র যেন সৎ মানুষের নয়, বরং সুযোগসন্ধানী ও শক্তিধরদের। বিশেষ করে ঋণখেলাপিদের বিষয়টি মানুষের হৃদয়ে গভীর আঘাত হেনেছে। এটি কেবল ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এটি শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের ফসল, প্রবাসীর কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স, ছোট ব্যবসায়ীর সঞ্চয়। যখন কেউ ইচ্ছা করে এই অর্থ ফেরত না দিয়ে বরং ক্ষমতার আসনে বসার সুযোগ পান, তখন মানুষ তিক্ত স্মৃতিতে ফিরে যান। তারা মনে করেন, কিভাবে একসময় বিশ্বাস ভেঙে দেয়া হয়েছিল। কিভাবে ক্ষমতা সেবার বদলে লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। কিভাবে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে আর তার বোঝা বহন করেছেন সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সেবা ও ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ ভয় অমূলক নয়। যে ব্যক্তি নিজের ঋণ শোধ করেননি, তিনি কিভাবে রাষ্ট্রের কোষাগার রক্ষা করবেন। এ প্রশ্ন আজ আর আবেগ নয়, এটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়া জিজ্ঞাসা।
এ কারণে আসন্ন নির্বাচন কেবল দল বা ব্যক্তির লড়াই নয়; এটি একটি নৈতিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। প্রত্যেক ভোটারের কাঁধে আজ ঐতিহাসিক গুরুদায়িত্ব। নীরবতা কিংবা অসতর্ক ভোট মানে একই দুর্নীতি, একই দায়মুক্তি, একই অবিচারের চক্র মেনে নেয়া। ভোট এখন আর শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি বিবেকের পরীক্ষা। কাকে ভোট দেয়া উচিত, পাশাপাশি কাকে দেয়া উচিত নয়, এ সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে গণভোট একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি সম্মিলিতভাবে বলার সুযোগ যে, দেশকে অবশ্যই ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সংস্কারের ভিত্তিতে এগোতে হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়া কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা নয়। এটি একটি স্বপ্নের পক্ষে অবস্থান, এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, যেখানে জনসেবা কোনো ব্যবসা নয় বরং দায়িত্ব, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাবানদের ঢাল না হয়ে জনগণের আশ্রয় হয়ে উঠবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে আশা। এটি ঘোষণা করে যে, আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে সৎ মানুষের মর্যাদা থাকবে, যেখানে লুটেরাদের ক্ষমতা দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে না, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়ের বাইরে স্বপ্ন দেখতে পারবে। এটি সেই লাখ লাখ সাধারণ মানুষের পক্ষে ভোট, যারা বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করেছেন, অথচ দেখেছেন একটি গোষ্ঠী দেশকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।
এই আবহের মধ্যে শেরপুরে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা জাতির বিবেক নাড়িয়ে দিয়েছে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতিকে রক্তাক্ত করেছে। এ ঘটনা স্বাভাবিকভাবে মনে করিয়ে দেয়, ২০০৬ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা, যখন রাজনৈতিক সন্ত্রাস প্রকাশ্য রূপ নিয়েছিল। তখন আমরা দেখেছি, কিভাবে উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা লগি-বৈঠা হাতে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাস ও নৃত্য করেছিল। সেটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছিল না; সেটি ছিল মানবতা, সভ্যতা ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক নগ্ন আক্রমণ। এমন দিন তো জনগণ চাননি। জনগণ কখনো রক্ত, লাশ আর প্রতিশোধের রাজনীতি চান না। মানুষ চান নিরাপত্তা, শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তারা চান এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভিন্ন মত মানে শত্রু নয়, আর ক্ষমতার লড়াই মানে প্রাণনাশ নয়। কিন্তু যখন আবার এমন হত্যাকাণ্ড ঘটে, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আবার সেই অন্ধকার গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছি?
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো হঠাৎ জন্ম নেয় না। এটি জন্ম নেয় আশ্রয়-প্রশ্রয় থেকে, নীরবতা থেকে, অপরাধীদের রক্ষার সংস্কৃতি থেকে। যখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের লাগাম টানে না, যখন অপরাধকে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ঢেকে রাখা হয়, তখন সেই সহিংসতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। একসময় তা আর দলের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তা সমাজকে গ্রাস করে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, আর সাধারণ মানুষকে চরম অনিরাপত্তার মধ্যে ঠেলে দেয়। আজ সংযত হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, উত্তেজিত ভাষণ, হুমকি আর ‘যা খুশি তাই করা যাবে’ ধরনের বার্তা আগুনে ঘি ঢালার শামিল। উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা দুর্বলতা নয়; এটি প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। যে দল নিজের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে দল রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক অধিকারও হারায়।
দেশকে ভালো বাসুন, এই আহ্বান আজ আর কোনো স্লোগান নয়; এটি জাতির টিকে থাকার শর্ত। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক মতভেদের নামে কাদা ছোড়াছুড়ি, ব্যক্তি আক্রমণ, অপমানজনক ভাষা ও অন্ধ পক্ষপাত কিভাবে সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। এতে কোনো দল জেতে না, দেশও জেতে না, হারি সবাই। দলের চেয়ে দেশ বড়, এ সত্য আজ বারবার উচ্চারণ করতে হচ্ছে, কারণ বাস্তবে উল্টো চর্চা বেশি। দলীয় স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের ওপরে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি ইতিহাসকেও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর পরিণতিতে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে, আর সমাজে বিভাজন স্থায়ী রূপ নেয়। অন্ধভাবে কোনো ব্যক্তি বা দলকে পূজা করার দিন সত্যি শেষ হওয়া উচিত। গণতন্ত্রে নেতা দেবতা নন; তারা জবাবদিহির আওতাভুক্ত কর্মচারী। প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা, ভুল ধরিয়ে দেয়া, এসব নাগরিক দায়িত্ব। যে সমাজে প্রশ্ন করাকে অপরাধ আর সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, সে সমাজ ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যায়।
ইচ্ছামতো ট্যাগিংয়ের রাজনীতিও আজ বড় বিপদ। ভিন্নমত মানে কাউকে দেশদ্রোহী, এজেন্ট বা শত্রু বানিয়ে দেয়া যুক্তিকে হত্যা করে, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। এতে সত্য চাপা পড়ে যায়, মিথ্যা আরো বেপরোয়া হয়। সংযম ও সতর্কতা আজ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নাগরিক গুণ। কথা বলার আগে ভাবতে হবে, এ ভাষা কি দেশকে এগিয়ে নেবে, নাকি বিভক্ত করবে? গুজব, অপপ্রচার ও আবেগ উসকে দেয়া বক্তব্যের ফাঁদে পড়ে আমরা যেন নিজেরা নিজেদের ক্ষতি না করি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন মানুষ যুক্তির বদলে আবেগে ভাসে, তখন দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে জামায়াত ও বিএনপি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। সেই সময় উভয়ে নির্যাতন সহ্য করেছে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে, এমনকি সরকার গঠনেও অংশীদার হয়েছে। অথচ আজ সেই মিত্রতা শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। সাইবার হ্যাকিং, অপপ্রচার, একে অন্যকে নাজেহাল করার প্রতিযোগিতা, সব মিলিয়ে রাজনীতির এ অবক্ষয় অনেকের মনে সন্দেহ জাগাচ্ছে, এর পেছনে কি কোনো বিশেষ মহল বা বিদেশী প্রভাব কাজ করছে না? আজ প্রশ্ন হলো, এই দুই দল কেন মুখোমুখি এবং এর মূল্য কে দিচ্ছে? উত্তর একটা, দেশ ও জনগণ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি একে অন্যকে স্পেস না দেয়, যদি প্রতিযোগিতা সহাবস্থানের বদলে সঙ্ঘাতে রূপ নেয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। রাজনীতি হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে, যুক্তি বনাম যুক্তি, পরিকল্পনা বনাম পরিকল্পনা, নীতি বনাম নীতি। লাঠি, আগুন আর ভাঙচুর কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না।
আজ সময় এসেছে ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে দেশ নিয়ে ভাবার। কাদা ছোড়াছুড়ি নয়, প্রয়োজন যুক্তি; অপমান নয়, প্রয়োজন সম্মান; অন্ধ আনুগত্য নয়, প্রয়োজন সচেতন নাগরিকত্ব। দেশ বাঁচলে আমরা বাঁচব, এই সহজ সত্য যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তাহলে আগামীর পথ আলোকিত হবে।
লেখক : রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]



