ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অসম্ভব

দ্বিচারিতা, কূটনৈতিক ধোঁকাবাজি এবং নৈতিক ভণ্ডামির সময় শেষ। যদি সত্যিই জীবন বাঁচাতে হয়, তাহলে এই সঙ্ঘাতের আসল উৎসে আঘাত হানতেই হবে। এক কথায়, ইসরাইলকে গণহত্যার দানবে পরিণত করার যে রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক স্থাপত্য, সেটিকে রক্ষা করা নয়, ভেঙে দিতেই হবে। তবেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বিশ্বমোড়লরা, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নামে দশকের পর দশক এক নিষ্ঠুর তামাশা চালিয়ে এসেছে। তারা শান্তির কথা বলেছে, কিন্তু যুদ্ধ, দখল, উচ্ছেদ, ধ্বংস তথা অশান্তির মূল শক্তিকাঠামোকেই রক্ষা করেছে। এই দ্বিচারিতার মূল্য দিয়েছে লাখো মানুষ। ফিলিস্তিনিরা সেই মূল্য দিয়েছে দখল, অবরোধ, বাস্তুচ্যুতি, অপমান ও বোমাবর্ষণের মাধ্যমে। ইসরাইলের সাধারণ মানুষও মুক্ত নয়; তারাও বন্দী হয়ে আছে এক স্থায়ী যুদ্ধরাষ্ট্রের মানসিকতা, ভয় এবং সামরিকীকৃত রাজনীতির ভিতরে, যেটিকে তাদের শাসকগোষ্ঠী ‘নিরাপত্তা’ নামে বৈধতা দেয়।

এখন সময় এসেছে সরাসরি সত্য বলার : ইসরাইল যতদিন একটি সামরিকভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর এবং সমগ্র অঞ্চলের ওপর নিজের ইচ্ছা বলপ্রয়োগে চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ধরে রাখবে, ততদিন ন্যায়ভিত্তিক ও স্থায়ী শান্তি আসবে না। দখল কোনো দুর্ঘটনা নয়। অবৈধ বসতি স্থাপন কোনো ভুল বোঝাবুঝি নয়। গাজার পুনঃপুন ধ্বংস, গণহত্যা, ফিলিস্তিনি ভূমিতে অবিরাম বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক শাসনের দৈনন্দিন অপমান এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকারকে ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার- এসবই সম্ভব হয়েছে ইসরাইলের সামরিক শক্তির কারণে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এই সমস্যার বাইরের কোনো বিষয় নয়। সেটাই এই সমস্যার প্রধান যন্ত্র।

আন্তর্জাতিক আলোচনাও শুরু থেকেই অসৎ ছিল। যখনই এই প্রশ্ন ওঠে, পশ্চিমা শক্তিগুলো দ্রুত বলে ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ আছে। কিন্তু এই ভাষা বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে এমন এক বাস্তবতাকে আড়াল করতে, যেখানে দখল, অবৈধ ভূমি দখল, অবরোধ এবং একটি জনগোষ্ঠীর ওপর স্থায়ী আধিপত্যকে আত্মরক্ষার নামে বৈধতা দেয়া হয়। কোনো রাষ্ট্রেরই অধিকার নেই অবৈধ দখলকে রক্ষা করার, অন্যের জমি জবরদখল করে রাখার, কিংবা সামরিক শক্তি দিয়ে একটি জাতির স্বাধীনতাকে চিরস্থায়ীভাবে অস্বীকার করার। আত্মরক্ষার ভাষা এখানে বহুবার আত্মগোপনের ভাষা হয়ে উঠেছে; আর সেই আত্মগোপনের আড়ালে টিকে আছে দীর্ঘস্থায়ী অবিচার।

এই কারণেই এতদিনের তথাকথিত শান্তি চুক্তিগুলো একের পর এক ব্যর্থ হয়েছে। শক্তির ভারসাম্য না বদলালে আলোচনা শুধু মঞ্চনাটক। কার্যকর চাপ ছাড়া যুদ্ধবিরতি কেবল পরবর্তী হামলার আগের বিরতি। শাস্তিহীন নিন্দা আসলে নীরব অনুমতি। যতদিন এক পক্ষ অপর পক্ষের তুলনায় সামরিক, ভূখণ্ডগত ও কূটনৈতিকভাবে বিপুল আধিপত্য ধরে রাখবে, ততদিন আলোচনা অন্যায়ের অবসান ঘটাবে না; বরং অন্যায়কে ব্যবস্থাপনার নতুন ভাষা দেবে।

বিশ্বের সামনে এখন মাত্র দুটো পথ খোলা। হয় মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বজায় থাকবে, অসম যুদ্ধ চলতেই থাকবে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অস্ত্রের পেছনে পুড়বে, আর মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হতে থাকবে; নয়তো ইসরাইলের সামরিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে কমিয়ে এনে ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই শান্তির বাস্তব ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। কাজেই যেকোনো বাস্তব সমাধানের কেন্দ্রীয় নীতি একেবারে স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রথমত, দখল এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক অবসান ঘটাতে হবে। ফিলিস্তিনি অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে পূর্ণ প্রত্যাহার, অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ সম্পূর্ণ বন্ধ ও প্রত্যাহার এবং প্রতিটি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর আন্তর্জাতিক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে কমিয়ে আনতে হবে। যে রাষ্ট্র শান্তির কথা বলে, সে একই সাথে স্থায়ী দমন-পীড়নের সামরিক যন্ত্রও অক্ষত রাখতে পারে না। এখানে সামরিক শক্তি কমানোর অর্থ কোনো জনগণকে অসুরক্ষিত ফেলে দেয়া নয়; এর অর্থ হলো সেই ক্ষমতাকে এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যাতে দখল, সম্প্রসারণ, অবরোধ ও ধ্বংস আর সম্ভব না হয়।

তৃতীয়ত, ইসরাইলের নিরাপত্তা আর যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সামরিক-শিল্প মুনাফাকেন্দ্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করতে পারে না। এর বদলে একটি নতুন আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মিসর, জর্দান, সৌদি আরব, অন্যান্য আরব রাষ্ট্র, আরব লিগ, ওআইসি এবং জাতিসঙ্ঘের বাধ্যতামূলক ভূমিকা থাকবে। নিরাপত্তা গ্যারান্টি হতে হবে সমষ্টিগত, শর্তযুক্ত এবং আন্তর্জাতিক আইন মানার সাথে বাঁধা- কোনো পক্ষের জন্য খোলা লাইসেন্স নয়।

চতুর্থত, ফিলিস্তিনিদের দিতে হবে সেই জিনিসগুলো, যেগুলোকে এতদিন আলোচনাযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, অথচ সেগুলো আসলে অবিচ্ছেদ্য অধিকার : স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং পূর্ণ মানবিক মর্যাদা। যে নিরাপত্তা কাঠামো ইসরাইলি রাষ্ট্রশক্তিকে রক্ষা করবে কিন্তু ফিলিস্তিনিদের খণ্ডিত, অবরুদ্ধ, দখলকৃত বা স্থায়ীভাবে অধীনস্থ অবস্থায় রেখে দেবে, তা কোনো বৈধ শান্তি নয়।

সমালোচকরা বলবে, এসব অবাস্তব। কিন্তু সত্যিকারের অবাস্তব হলো এই বিশ্বাস যে কোটি মানুষের অধিকার অস্বীকার করে চিরকাল স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে। অবাস্তব হলো এই ধারণা যে সামরিক আধিপত্য আর শান্তি পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে। অবাস্তব হলো এই আশা যে ফিলিস্তিনিরা রাজনৈতিকভাবে, নৈতিকভাবে, ঐতিহাসিকভাবে মুছে যাবে- শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাই চায় বলে।

অনেকে বলবে, ইসরাইলের সামরিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে কমিয়ে আনলে ইসরাইলিরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো কথা বলে। স্থায়ী সামরিকীকরণ নিরাপত্তা আনেনি; এনেছে পুনরাবৃত্ত যুদ্ধ, ভয়, চরমপন্থার বিস্তার এবং ধ্বংসের চক্র। যে সমাজ আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সে নিরাপদ হয় না; বরং একটি অন্যায় ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ক্রমাগত আরো বেশি সহিংসতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

দ্বিচারিতা, কূটনৈতিক ধোঁকাবাজি এবং নৈতিক ভণ্ডামির সময় শেষ। যদি সত্যিই জীবন বাঁচাতে হয়, তাহলে এই সঙ্ঘাতের আসল উৎসে আঘাত হানতেই হবে। এক কথায়, ইসরাইলকে গণহত্যার দানবে পরিণত করার যে রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক স্থাপত্য, সেটিকে রক্ষা করা নয়, ভেঙে দিতেই হবে। তবেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে।

লেখক : কানাডা প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক