রমজানে সংযম ও ঐক্যের অনুশীলন চাই

জাফর আহমাদ
সংযম অনুশীলনের মাস রমজান। এ মাসে নিজের বৈধ দু’টি কাজ তথা : খাদ্য গ্রহণ ও যৌনতা থেকে বিরত থেকে সংযমের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হয়। ক্রমাগত একটি মাস এই সংযম প্রদর্শনের মাধ্যমে নফস যা কামনা-বাসনা ও লালসাকে তাড়িত করে তা দুর্বল করা হয়, ফলে বিবেক শক্তিশালী হয়। মানুষের নৈতিক শক্তির ভিত অত্যন্ত মজবুত ও স্থায়িত্ব লাভ করে।

আপনি একটি মাস বৈধ জিনিস থেকে নিজেকে বিরত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কেবল আল্লাহর হুকুমকে বাস্তবায়নের জন্য। তাহলে একটি নফলকে কেন্দ্র করে কেন এত বিতর্ক? আপনি জানেন, এই বিতর্কের ফলে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট হয়। অথচ মুুসলমানদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করা অবশ্য কর্তব্য। অনৈক্য সৃষ্টি করা মূলত এটি সুপরিকল্পিত প্ররোচনা। বিতর্ক হলো— তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা। রমজানের আগে চলে শাবানের লাইলাতুল বারাত নিয়ে। আসলে রোজাদারদের সংযমকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য শয়তান প্ররোচনা দিয়ে থাকে। এ জন্যই প্রতি বছর রমজান আসে, রমজান যায়; কিন্তু আমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই থেকে যাই। রোজাদারদের মধ্যে পরিবর্তনের কোনো চিহ্ন পরিলক্ষিত হয় না।

রমজান আসে প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থী ভাইবোনকে একটি মাস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় রূপান্তর করতে। ক্রমাগত একটি মাস তাকওয়ার অনুশীলনে প্রতিটি প্রাণকে উজ্জীবিত করা হয়। সারা পৃথিবী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা— ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে তাকওয়ার বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিফলন দেখবে। সবই গুড়েবালি, প্রশিক্ষণ চলাকালীন অযথা বিতর্ক ও অসহিষ্ণুতায় আমাদের সবকিছুই ভেস্তে যায়।

শাবানের ‘শবেবরাত’ নিয়ে সে-ই কী বিতর্ক। শাবান শেষ হওয়ার সাথে সাথে সে বিতর্ক স্তিমিত হয়ে এলেও এখনই নতুন এক বিতর্ক শুরু হবে তারাবিহ সালাতের রাকাত সংখ্যা নিয়ে। মোটামুটি সারা রমজানজুড়ে বিতর্ক চলবে। তারাবিহ আট রাকাত হবে নাকি ২০ রাকাত। এ জন্য একে-অন্যকে ঘায়েল করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অসংযমী বাক্য ব্যবহার করবে। এমনকি একজন-অন্যজনকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অথচ নিম্নের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— ‘হে নবী! প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা এবং সদুপদেশ সহকারে তোমার রবের পথের দিকে দাওয়াত দাও এবং লোকদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। তোমার রবই বেশি ভালো জানেন কে তাঁর পথচ্যুত হয়ে আছে এবং কে আছে সঠিক পথে।’ (সূরা আন নাহল-১২৫) আল্লাহ বলছেন— ‘তোমার রবই বেশি ভালো জানেন কে তাঁর পথচ্যুত হয়ে আছে এবং কে আছে সঠিক পথে।’ তাহলে আপনি কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন, আপনি যে জিনিস নিয়ে তর্ক করছেন তাতে আপনিই সঠিক পথে আছেন। আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় শুদ্ধ মতটি অন্যকে বোঝানোর, তাহলে আয়াতের নির্দেশনা হচ্ছে— আপনাকে দু’টি জিনিসের প্রতি অবশ্যই নজর রাখতে হবে। ১. প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা এবং ২. সদুপদেশ।

জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার মানে হচ্ছে— নির্বোধদের মতো চোখ বন্ধ করে আপনার যুক্তি প্রদর্শন করলে হবে না; বরং বুদ্ধি খাঁটিয়ে যাকে বোঝানোর দায়িত্ব নিয়েছেন, তার মন-মানস, যোগ্যতার অবস্থার প্রতি নজর দিন এবং পরিবেশ পরিস্থি’তি বুঝে কথা বলুন। উত্তম পন্থায় তর্ক করার হুকুম দেয় ইসলাম। জেদ ও বিতর্ক পরিহার করে একে-অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আলোচনা হতে পারে। তবে এ আলোচনায় কারো প্রতি হিংসা প্রদর্শন, কু-ধারণার বশবর্তী হয়ে ঘায়েল করার চিন্তা থাকতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, যার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছি, তিনি আমার মতোই একজন মুসলমান।

সংযমের প্রতিশব্দ হচ্ছে— নিয়ন্ত্রণ, দমন, রোধ, নিরোধ, সংবরণ, প্রশমন, নিবারণ, নিবৃত্ত, বশীভূত প্রভৃতি। সে অর্থে রমজান আমাদের শিক্ষা দেয়, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিজের নফসকে বশীভূত করা, জেদ ও হিংসাকে দমন করা, রাগ সংবরণ করা বা প্রশমন করা। বাক্য, ভাষা ও ইন্দ্রিয় সংযমও রমজানের শিক্ষা। কিন্তু তারাবিহ সালাতকে কেন্দ্র করে দু’দল রোজাদারের যদি সারা মাস ঝগড়া লেগেই থাকে, তাহলে সংযম হবে কী করে। এই ঝগড়ার ফলে এই মাসটিকে নিরঙ্কুশ সংযমের মাস বলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে আরেক দল রোজাদার ব্যবসায়ী দুনিয়ার স্বার্থ, স্বাদ ও আরাম-আয়েশের কারণে রমজানকে এক বিরাট সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। দু’হাতে মুনাফা লোটার জন্য রমজানে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুণ্ঠনের জন্য কালোবাজারি ও খাদ্যে ভেজাল মিশ্রিত করে। প্রবৃত্তির লালসার মোকাবেলা করার পরিবর্তে এরা তার সামনে নতজানু হয়।

পার্থিব লোভ-লালসার জন্য আল্লাহর দেয়া অপার রহমতের সুযোগ-সুবিধাকে পরিত্যাগ করে দুনিয়ার লালসাকে চরিতার্থ করার জন্য সম্মানিত রোজাদারদেরকে কষ্ট দেয়। এ ধরনের লোভী-লালসার অধিকারী ব্যক্তিদের আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ঘৃণিত প্রাণীর সাথে তুলনা করেছেন। সংযমের আরো দু’টি প্রতিশব্দ হলো— মিতাচার ও পরিমিতি। সারা রমজানে ইফতারের আয়োজন থেকে শুরু করে ঈদের কেনাকাটায় আমাদের দেশের কোথাও সংযম, মিতাচার ও পরিমিতি আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। অথচ এ মাসে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-খয়রাত করার কথা ছিল।

বুখারি শরিফে ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, নবী সা: সর্বাপেক্ষা বেশি দানশীল ছিলেন। তাঁর দানের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি হতো। আল্লাহ দানের প্রতিদান ৭০০ গুণ বাড়িয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই মাসটি হতে পারে তা চর্চা করার। আমরা বেশি বেশি দান করে অসচ্ছলদের কষ্ট লাঘব করতে পারি। দানের জন্য এর চেয়ে উত্তম মৌসুম আর কোনটি হতে পারে? এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের জন্য, গরিব-দুঃখী, এতিম ও অসহায় মানবতার জন্য খরচ করা হবে। রমজান সমাপ্তির পরপরই আসে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে খুশির ঈদ। এই ঈদকে ধনী-গরিব সব মুসলমানের ঘরে পৌঁছে দেয়ায় জাকাত বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ মাসে জাকাতের সম্পূর্ণ টাকা আদায় করার জন্য বিশেষ তাগিদও করা হয়েছে।

সংযমের বৈশিষ্ট্য হলো— মিতব্যয়ী ও পরিমিত ব্যয় করা; কিন্তু অপচয় করা যাবে না। এটি শয়তানের প্ররোচনায় হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন— ‘...অপব্যয় করো না। নিশ্চই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭) আল্লাহ আরো বলেন— ‘...আর খাও ও পান করো; কিন্তু সীমা অতিক্রম করো না, আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আরাফ-৩১) হালালকে হারাম, হারামকে হালাল করার মাধ্যমে তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করা তিনি পছন্দ করেন না।

সুতরাং রোজা রাখুন, অধিকতর সংযমী হোন। সহনশীলতা ও সহাবস্থানের অভ্যাস গড়ে তুলুন। রাগ, জেদ ও হিংসাকে প্রতিরোধ করুন। বিতর্ক এড়িয়ে চলুন। মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে, সে ধরনের কাজের সংশ্লিষ্টতা বাড়িয়ে দিন। এসব গুণ অর্জন করার জন্য প্রতি বছর রমজান আমাদের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে।