সাঈদ বারী
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বহুবার আকস্মিক ঘটনার অভিঘাতে নতুন বাঁক নিয়েছে। তবে ইসরাইলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদতের মতো ঘটনা সমকালীন ইতিহাসে মারাত্মক ভূকম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এই সম্ভাব্যতা কেবল তেহরান বা তেল আবিবের কৌশলগত হিসাব বদলাবে না, বরং ওয়াশিংটন থেকে মস্কো, বৈরুত থেকে গাজা পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা স্থাপত্য নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড়াবে। ফলে বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতি কেবল সামরিক প্রতিশোধ বা পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা, প্রতিরোধের আদর্শ এবং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি জটিল পর্বে রূপ নিতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান সাংবিধানিক ও আদর্শিক উভয় দিক থেকেই কেন্দ্রীয়। তার মৃত্যু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শোকের আবেগ সৃষ্টি করলেও এর সাথে সাথে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদ কেবল ধর্মীয় মর্যাদা নয়, বরং সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত কর্তৃত্বের প্রতীক। সেই প্রতীক যদি হঠাৎ অনুপস্থিত হয়, তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে উঠবে। বিশেষত ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর বা IRGC তখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। এতে ইরানের প্রতিশোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ আরো আক্রমণাত্মক হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এই ঘটনার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া আসবে ইরানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্ন থেকে। ইরানের শাসনব্যবস্থা নিজেকে বিপ্লবের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরে। তাই সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকে তারা কেবল একটি সামরিক আঘাত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিশোধ নেয়ার রাজনৈতিক চাপ অত্যন্ত তীব্র হবে। তেহরানের নীতিনির্ধারকরা সরাসরি ইসরাইলে আঘাত হানবেন, নাকি আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে প্রতিরোধের কৌশল নেবেন, সেটিই হবে পরবর্তী পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইসরাইলের জন্য এই হামলা কৌশলগতভাবে দ্বিমুখী ফল বয়ে আনতে পারে। একদিকে তারা মনে করতে পারে যে, শত্রুপক্ষের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আঘাত হেনে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। অন্যদিকে এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলবিরোধী শক্তিগুলোর ঐক্যকে আরো দৃঢ় করতে পারে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং গাজায় হামাস ইরানের নিকটতম মিত্র হিসেবে পরিচিত। খামেনির মৃত্যুকে তারা প্রতিরোধের প্রতীকী ক্ষতি হিসেবে দেখলে বহুমুখী ফ্রন্টে সঙ্ঘাত তীব্রতর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফলে ইসরাইলের নিরাপত্তা কৌশল স্বল্পমেয়াদে সাফল্যের দাবি করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত জটিল। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। একই সাথে তারা মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়াতে চায়। এই হামলার সাথে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, তাই ইরানের প্রতিক্রিয়া কেবল ইসরাইলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইতোমধ্যে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান আঘাত হেনেছে। পারস্য উপসাগর, ইরাক কিংবা সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি কৌশলগত দ্বন্দ্বে পড়বে যেখানে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ও বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠবে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও নতুন চাপ তৈরি করবে। জাতিসঙ্ঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালেও বাস্তবে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থসঙ্ঘাতের কারণে তা কার্যকর হওয়া কঠিন। ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইরানের সাথে পারমাণবিক সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতার হত্যার মতো ঘটনা সেই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রায় অচল করে দিতে পারে। ইরান তখন পারমাণবিক কর্মসূচি আরো দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়ার রাজনৈতিক যুক্তি পেতে পারে, যা আবার ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে তীব্র করবে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতায় যুদ্ধ কখনো এক দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। ইরান যদি সরাসরি আঘাত না করে বরং তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রতিশোধ নেয়, তবে সঙ্ঘাতের বিস্তার ধীরে কিন্তু গভীরভাবে ঘটবে। সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে যুদ্ধের রূপ হবে ছায়াযুদ্ধের মতো, যেখানে কোনো একটি দেশকে দায়ী করা কঠিন হলেও বাস্তবে সঙ্ঘাত ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। এই কৌশল ইরানের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অঞ্চলজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়াবে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকেও ইরানের জন্য এটি এক পরীক্ষার মুহূর্ত। শাসকগোষ্ঠী যদি এই ঘটনাকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করতে পারে, তবে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতি বজায় থাকবে। কিন্তু ইতিহাস দেখায় যে বড় নেতৃত্বের আকস্মিক অনুপস্থিতি অনেক সময় রাষ্ট্রকে আরো রক্ষণাত্মক ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক করে তোলে। এতে সংস্কারপন্থী কণ্ঠগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং কঠোর অবস্থান জোরদার হয়। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ সঙ্কুচিত হতে পারে।
ইসরাইলের ভেতরেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া একরৈখিক হবে না। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ এই হামলাকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু একই সাথে সাধারণ জনগণের মধ্যে সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়বে। নেতৃত্বকে হত্যা করে সাময়িক শূন্যতা তৈরি করা সম্ভব মতাদর্শকে নির্মূল করা যায় না।
এই পুরো প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যও নতুনভাবে বিবেচিত হবে। রাশিয়া ও চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না, সেটি অনিশ্চিত হলেও কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্য আবারো বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের পর যে একমেরু বিশ্বব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল, তা ক্রমেই বহুমেরু বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর মতো ঘটনা সেই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই সঙ্ঘাত কি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে গড়াবে, নাকি সীমিত প্রতিশোধ ও কূটনৈতিক চাপে সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তবতা বলছে, সব পক্ষই বৃহৎ যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন। পারস্য উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ কোনো পক্ষকেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না। তাই সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও ছায়া সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
এই সম্ভাব্য ঘটনার তাৎপর্য কেবল একটি নেতৃত্বের মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার মানচিত্র, প্রতিরোধ রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত কোন পথে গড়াবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কৌশলগত সংযম ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর। যদি সংযমের বদলে আবেগ প্রাধান্য পায়, তবে এই ঘটনাই বৃহত্তর আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। আর যদি কূটনীতি সক্রিয় হয়, তবে এটিই হয়তো হবে নতুন এক সমঝোতার কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় সূচনা।
লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক


