আসবাবপত্র ও গৃহনির্মাণে কাঠের বিকল্প

এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিভিন্ন বিকল্প উদ্ভাবনে কাঠের ব্যবহারে হ্রাস ঘটলেও প্রাকৃতিক সম্পদ হওয়ায় এর চিরন্তন চাহিদা কখনো নিঃশেষিত হওয়ার নয়। এ কারণে শত প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কাঠ নিজ গুণে অক্ষয় হিসেবে টিকে থাকবে।

কাঠ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। আমাদের দেশে আসবাবপত্র, গৃহনির্মাণ, নৌযান তৈরি, রেললাইনের স্লিপার, কৃষি উপকরণ, যানবাহন, শিল্প কারখানা, জ্বালানি প্রভৃতি ক্ষেত্রে কাঠ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশ শতকের আগে আমাদের দেশে গৃহনির্মাণে ছনের ঘরের আধিক্য ছিল। ছনের ঘর বলতে যা বুঝায় তা হলো ঘরের ছাউনি ছন দ্বারা আবৃত থাকত। ঘরের খুঁটি ও ছাউনির নিচের অবকাঠামো বাঁশ দ্বারা তৈরি হতো। ঘরের বেড়া প্রস্তুতে ছন, বাঁশ এবং পাটখড়ি ব্যবহৃত হতো। বিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকে আমাদের দেশে টিনের ঘরের ব্যবহার শুরু হলে ঘরের অবকাঠামো নির্মাণে কাঠের প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক হয়ে পড়ে। টিনের ঘরের খুঁটি, দরজা, জানালা, বেড়া, টিনের চালার অবকাঠামো তৈরিতে একমাত্র কাঠই উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হতো।

দেশে বিংশ শতকের শেষের দিক হতে গৃহনির্মাণে ইটের দালান-ঘর তৈরি শুরু হয়। তখন গ্রামাঞ্চলে ইটের দালান-ঘরের ছাউনি টিন দ্বারা আবৃত থাকত; তবে বর্তমানে গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে বহুতল ভবন নির্মাণে কংক্রিটের ছাদ ব্যবহৃত হয়। অতীতে ইটের দালান ও বহুতল ভবনে দরজা-জানালার উপকরণ হিসেবে কাঠকে প্রাধান্য দেয়া হতো। বর্তমানে জানালায় থাই-অ্যালুমিনিয়াম, লোহার পাত ও কাচের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। দরজার ক্ষেত্রে কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টেক্স, প্লাইউড, হার্ডবোর্ড, ফাইবার বোর্ড, প্লাস্টিক উড প্রভৃতির প্রচলন পরিলক্ষিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে লোহার পাতের ওপর প্লেইন শিট ব্যবহার করে দরজা প্রস্তুত করা হয়। আবার এমনও দেখা যায়, ঘরের মূল দরজা কাঠ দ্বারা প্রস্তুত হলেও বাথরুম ও কিচেনে প্লাস্টিক উড ব্যবহৃত হয়।

আসবাবপত্র নির্মাণে দেশে অতীতে একমাত্র কাঠ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে আসবাবপত্র নির্মাণে কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টিক্যাল বোর্ড, ইঞ্জিনিয়ার্ড কাঠ ও প্লাইউড, উড প্লাস্টিক, কম্পোজিট বোর্ড, বাঁশ, বেত, লোহা, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার বোর্ড, পিভিসি বোর্ড, রাবার কাঠ, ফরমাইকা প্রভৃতির ব্যবহার দেখা যায়। পার্টিক্যাল বোর্ড সস্তা এবং আধুনিক আসবাবপত্র যেমন- আলমারি, বুকশেলফ ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ইঞ্জিনিয়ার্ড কাঠ ও প্লাইউড কাঠের পাতলা আস্তরণ দিয়ে তৈরি যা মজবুত ও টেকসই।

এটি আসবাবপত্রের কাঠামো তৈরিতে অত্যন্ত উপযোগী। উড প্লাস্টিক কম্পোজিট বোর্ড এটি কাঠ এবং প্লাস্টিকের সংমিশ্রণে তৈরি যা অত্যন্ত শক্তিশালী, মজবুত, পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং পুরোপুরি পানিরোধী। বাঁশ ও বেত পরিবেশবান্ধব, নমনীয় এবং ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী একটি দ্রুত উৎপাদনশীল উপাদান। লোহা, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম দরজা, জানালা এবং আধুনিক আসবাবের কাঠামো হিসেবে এগুলো দীর্ঘস্থায়ী, হালকা এবং মরিচা প্রতিরোধী। মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার বোর্ড মসৃণ ফিনিশিংয়ে কেবিনেট ও ওয়্যারড্রব তৈরিতে ব্যবহৃত হয়; তবে এটি পুরোপুরি পানিরোধী নয়। লেমিনেট ও ভিনিয়ার সাধারণত বোর্ডের উপরে সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয়, যা কাঠের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সহায়ক। পিভিসি বোর্ড রান্নাঘর ও বাথরুমের কেবিনেটে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, এটি সম্পূর্ণ পানিরোধী। রাবার কাঠ রাবার গাছ থেকে পাওয়া, যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। ফরমাইকা হলো এক ধরনের প্লাস্টিকের আবরণ, যা কাঠের বিকল্প হিসেবে সৌন্দর্য বর্ধন কাজে ব্যবহৃত হয়। কাঠের তুলনায় এ বিকল্পগুলো সাধারণত সাশ্রয়ী, কম রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, সহজে বাঁকানো বা আকার দেয়া যায় এবং পরিবেশ রক্ষায় সাহায্য করে।

অতীতে বিভিন্ন ডেকোরেটর বিয়ে বা যেকোনো অনুষ্ঠানে ফোল্ডিং কাঠের চেয়ার ও ফোল্ডিং কাঠের টেবিল ব্যবহার করত। বর্তমানে ফোল্ডিং কাঠের চেয়ার ও ফোল্ডিং কাঠের টেবিলের পরিবর্তে প্লাস্টিকের চেয়ার ও টেবিল বা মেটালের চেয়ার ও টেবিল ব্যবহার করছে। অফিস-আদালতের ক্ষেত্রেও দেখা যায় কাঠের পরিবর্তে মেটালের চেয়ার-টেবিল প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক হওয়ায় এ দেশে নৌযোগাযোগের গুরুত্ব অপরিসীম। অতীতে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাঠের তৈরি নৌযানের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কাঠের পাশাপাশি স্টিল ও প্লাস্টিকের নৌযানের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। তবে গ্রামাঞ্চলে ও খেয়া পারাপারে এখনো কাঠের তৈরি নৌযান একমাত্র বাহন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাঠের নৌযানের পরিবর্তে স্টিলের নৌযানের ব্যবহার সর্বতোভাবে দেখা যায়।

আমাদের দেশে স্থলপথে যোগাযোগ রক্ষায় রেললাইন একসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন রেললাইনে কাঠের তৈরি স্লিপার ব্যবহৃত হতো; তবে বর্তমানে কাঠের তৈরি স্লিপারের পরিবর্তে কংক্রিটের তৈরি স্লিপার ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ক্রমান্বয়ে দ্রুত কাঠের তৈরি স্লিপারের ব্যবহারে হ্রাস ঘটছে, যা অচিরে কাঠের তৈরি স্লিপারের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে এমনটি অনুভূত হয়।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় একসময় এ দেশে কৃষিকাজে একচ্ছত্রভাবে লাঙ্গল ব্যবহৃত হতো। লাঙ্গল কাঠের তৈরি, যদিও এর অগ্রভাগে লোহার ফলা ব্যবহৃত হতো। জমি চাষাবাদের সময় গরুর কাঁধে বাঁশ বা কাঠের তৈরি জোয়াল ব্যবহৃত হতো। জমিতে মই দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মই বাঁশ দ্বারা তৈরি হতো। বর্তমানে ট্রাক্টর ও পাওয়ারটিলার ব্যবহারে লাঙ্গলের ব্যবহার দ্রুত কমছে। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে অল্প সময়ে ও কম খরচে দ্রুত জমি চাষ করা যায় বিধায় এর চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে লাঙ্গলের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে। লাঙ্গলের ব্যবহারে ভাটার কারণে এ ক্ষেত্রে কাঠের ব্যবহার অনেকটা সমাপ্তির পথে।

যোগাযোগে রেলের বিকল্প হিসেবে সড়কপথ ক্রমান্বয়ে জায়গা দখল করে নিয়েছে। সড়কপথে যোগাযোগের গণপরিবহন হলো বাস, অটোরিকশা, রিকশা প্রভৃতি। মালামাল পরিবহনে ট্রাক ও ভ্যানের ব্যবহার চালু রয়েছে। অতীতে এসব বাহনের কাঠামো প্রস্তুতে কাঠের ব্যাপক ব্যবহার ছিল, যা বর্তমানে স্টিল, লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এতে করে কাঠের ব্যবহার অনেকটা নাই বললে চলে।

অতীতে শিল্প কারখানার শেড নির্মাণে কাঠের অবকাঠামোর ওপর টিনের ছাউনি ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে শেড নির্মাণে কাঠের পরিবর্তে কংক্রিট বা স্টিল বা লোহার খুঁটি এবং ছাউনির নিচের অবকাঠামোতে লোহার পাত ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে কাঠের ব্যবহার শুধু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিতদের আসবাবপত্রে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেটাল বা লেমিনেটেড চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করে থাকে।

বিশ শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত গৃহস্থালি রান্নার চুলায় একমাত্র কাঠের ব্যবহার হতো। তখন গ্রামাঞ্চলে কাঠের পাশাপাশি খড়, শুকনা পাতা, ধানের কুঁড়া, পাটখড়ি প্রভৃতির ব্যবহার ছিল। পর্যায়ক্রমে মাটির চুলার স্থলাভিষিক্ত হয়ে উঠে প্রথমত : কেরোসিন ও পরবর্তীতে গ্যাসের চুলা। বর্তমানে ইলেকট্রিক চুলার প্রচলনও বেড়েছে। তবে, এখনো গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ বাড়িতে কাঠ, খড়, শুকনা পাতা, ধানের কুঁড়া, পাটখড়ি প্রভৃতির ব্যাপক ব্যবহার চালু রয়েছে।

পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশের মূল ভূ-ভাগের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। আমাদের দেশে এর পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫৮ ভাগ। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশে বর্তমানে কাঠের যে চাহিদা তা অভ্যন্তরীণভাবে মিটানো সম্ভব নয় বিধায় আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আমদানি করা কাঠ বিশেষত গৃহনির্মাণে ঘরের চৌকাঠ ও দরজা এবং আসবাবপত্র নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। অতীতে বিদ্যুতের লাইন সঞ্চালনে আমদানি করা কাঠের খুঁটি ব্যবহৃত হতো; অতঃপর বর্তমানে দেশীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত সিমেন্টের খুঁটি ও আমদানি করা অ্যালুমিনিয়ামের খুঁটি ব্যবহারে কাঠের খুঁটির ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

আমাদের কাঠের মূল জোগান আসে বনভূমি, বাড়ির আঙিনার গাছপালা, সড়কপথের দু’ধারের গাছপালা প্রভৃতি হতে। আমাদের চাহিদার তুলনায় এর জোগান পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে যদিও কাঠের বিভিন্ন বিকল্পের উদ্ভাবনে কাঠের ব্যবহার কমতির দিকে। কিন্তু দেশের সামগ্রিক চাহিদার বিবেচনায় তা অপ্রতুল।

কাঠের বিভিন্ন বিকল্পের উদ্ভাবন ঘটলেও এখনো রুচিশীল ব্যক্তিরা টেকসই, মজবুত ও নান্দনিকতার বিবেচনায় আসবাবপত্র এবং গৃহনির্মাণে দেশে উৎপাদিত সেগুন কাঠ বা আমদানি করা সেগুন কাঠ ব্যবহার করে থাকেন। দেশে চাহিদার তুলনায় কাঠের জোগান অপ্রতুল হওয়ায় যেকোনো গাছ পরিপক্ব হওয়ার আগেই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কেটে নিজস্ব অভিলাষ পরিপূর্ণ করছে। এতে দেশ ও পরিবেশ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আমাদের বনভূমি হতে ব্যাপক হারে গাছপালা নিধনে বনভূমিতে পরিপক্ব গাছ চোখে পড়ে না। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের অধিকাংশ পাহাড় বৃক্ষশূন্য। বিপরীতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের পাহাড়সমূহ গাছপালায় পরিপূর্ণ। এসব দেশের গাছপালা পরিপক্ব না হলে কাটা হয় না।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিভিন্ন বিকল্প উদ্ভাবনে কাঠের ব্যবহারে হ্রাস ঘটলেও প্রাকৃতিক সম্পদ হওয়ায় এর চিরন্তন চাহিদা কখনো নিঃশেষিত হওয়ার নয়। এ কারণে শত প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কাঠ নিজ গুণে অক্ষয় হিসেবে টিকে থাকবে।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]